মন্টোর গল্পের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় খুব সম্ভব ১৯৫৬-৫৭ সালে। তখন আমি পাকিস্তানে থাকতাম। সেই সময় মন্টোর দু-চারটি গল্প পড়লেও আমাকে তেমনভাবে ভাবিয়ে তােলেনি বা আকৃষ্ট করেনি। হয়তাে তা করেনি আমার বয়সের জন্যে। পরবর্তী সময়ে অনেক অগ্রজপ্রতিম সাহিত্যিকদের কাছে মন্টোর কথা শুনেছি জেনেছি। মন্টোর অপ্রত্যাশিত মৃত্যু অনেককে দুঃখিত করেছে—অভিভূত করেছে। বলেছেন আমরা নীলকণ্ঠকে হারালাম। স্থা, মন্টো ছিলেন নীলকণ্ঠ। তিনি সমাজের বিষকে আকণ্ঠ পান করে নিজের দেহ এবং মনে নিয়েছেন সেই বিষের জ্বালা। আর সেই বিষ অমৃত হয়ে তার কলম দিয়ে নিঝরিণীর মতাে প্রবাহিত হয়েছে। এই বিষ পান করে মন্টো আত্মসুখে সমাহিত হয়ে থাকেননি। বরং ডমরু বাজিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করেছেন—পৃথিবীকে ঝাপিয়ে তুলেছেন। '
মণ্টোকে আমি পরবর্তী সময়ে এইভাবে বােঝার চেষ্টা করেছি। তাই তার অশ্লীলতা ব্যঙ্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। তার শ্লেষ তাই বর্শা ফলকের মতাে মুক— বধির হৃদয়কে এফোঁড় ওফোড় করেছে। এফোঁড় ওফোড় করে উন্মুক্ত আকাশের নীচে তুলে ধরেছেন। তাই তার ব্যঙ্গ-তার শ্লেষকে অশ্লীল বলে কে উড়িয়ে দিতে সাহস করবে? এমন হিম্মত কার আছে?
শুধু সামাজিক অসাম্য অনৈতিকতা নিয়ে তিনি তােলপাড় করেননি। চলে গিয়েছেন তার কারণে অনেক গভীরে। যেখানে সততঃ কাজ করছে রাজনৈতিক এবং সামাজিক নেতৃত্বের ভণ্ডামী তার মূল ধরে টান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যে গান্ধীবাদের নির্বী মতাদর্শ কয়েক দশক ধরে স্বাধীনতার উদগ্র বাসনাকে ছিন্নভিন্ন করেছে তাকে বিপথে চালিয়েছে এবং তার জঙ্গীপনাকে স্টেরেলাইবেশন করেছে এবং এখনও করে চলেছে তার মুখােশ ছিড়ে ফেলতে তিনি এতটুকু সাহস হারাননি। বরং সেই মতাদর্শের ভণ্ডামী-বদমাইশির বিরুদ্ধে কলম ধরতে তাঁকে শক্তি জুগিয়েছিল তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক চেতনা, রাজনৈতিক সততা এবং নিষ্ঠা।
এই চেতনা নিষ্ঠা এবং সততা তার লেখার ক্ষমতায় জুগিয়েছে প্রেরণা। তাই মন্টোকে আমরা নেগেটিভ থেকে পজেটিভে উত্তরিত হতে দেখি। এই নেগেটিভকে তিনি এমনভাবে রূপান্বিত করেছেন যেখান শুধু পজেটিভের ক্লেদাক্ত মুখকে ধুয়ে মুছে পরিচ্ছন্ন করে নিতে হবে পাঠককে। মন্টোর পাঠককে হতে হবে তাই সমাজ সচেতন।
দেশ বিভাগের দু-তিন বৎসর পর পাকিস্তান এবং হিন্দুস্থানের সরকারের খেয়াল হল কয়েদীদের মতাে পাগলদের আদান প্রদান হওয়া প্রয়ােজন। অর্থাৎ যে সব মুসলমান পাগল হিন্দুস্থানের পাগলা গারদে আছে তাদের পাকিস্তানে এবং যে সব হিন্দু ও শিখ পাকিস্তানের পাগলা গারদে আছে তাদের হিন্দুস্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
জানি না এ ঠিক ছিল কি বেঠিক ছিল। যাই-ই হােক, বুঝদার মানুষের রায় অনুসারে উচ্চস্তরের কনফারেন্স হল এবং শেষে এক দিন পাগলদের আদন-প্রদানের ব্যবস্থা ঠিক হয়ে গেল। খুটিয়ে খুটিয়ে অনুসন্ধান চালানাে হলাে। যে সব মুসলমান পাগলদের আত্মীয়-স্বজন হিন্দুস্থানে আছে তাদের সেখানেই রাখা ঠিক হল। আর পাকিস্তান থেকে যেহেতু সব হিন্দু এবং শিখ হিন্দুস্থানে চলে গিয়েছে তাই কাউকেই আর এখানে রাখার কথাই ওঠে না। যত হিন্দু এবং শিখ পাগল ছিল তাদের পুলিশের পাহারায় সীমান্তে পোঁছে দেওয়া হল। ওদিককার কোন খবর নেই। কিন্তু এ দিকে লাহােরের পাগলা গারদে এই আদান-প্রদানের খবর পেীছলে খুব মজার মজার ঘটনা ঘটল। এক মুসলমান পাগল, যে বারো বৎসর ধরে প্রতিদিন নিয়মিত জমিদার পত্রিকা পড়ে আসছে, তাকে তার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল, “মৌলভী সাহাব, এই পাকিস্তান বস্তুটা কি?” মৌলভী সাহেব খুব গভীর ভাবে কিছু চিন্তা করে বলল, “হিন্দুস্থানের মধ্যে এ এমন এক জায়গা যেখানে খুর তৈরী হয়।”
মৌলভী সাহেবের উত্তর শুনে তার বন্ধু আর কোন কথাই বলল না।
একজন শিখ পাগল আর একজন শিখ পাগলকে জিজ্ঞেস করল, “সর্দারজী, আমাদের হিন্দুস্থানে কেন পাঠানাে হচ্ছে। আমার ততা ওখানকার ভাষা জানা নেই।” অন্য শিখ পাগলটি হেসে বলল, “আমার কিন্তু হিন্দুস্থানের ভাষা জানা আছে। তবে হিন্দুস্থানীরা খুব ভাটের মাথায় চলা-ফেরা করে।”
একদিন এক মুসলমান পাগল স্নান করতে করতে এমন জোড়ে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিল যে, পা পিছলে সে শানের ওপর পড়ে বেহুশ হয়ে গেল। এমন কিছু পাগল ছিল যাদের ঠিক পাগল বলা যায় না। এদের অধিকাংশই ছিল খুনী। এই সব খুনীদের সঙ্গে জড়িত অফিসাররা ফঁাসীর দড়ি থেকে তাদের বাঁচানাের জন্যে অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে এখানে পাঠিয়েছে।
এরা অবশ্য কিছু কিছু বােঝে, দেশ বিভাগ কেন হয়েছে এবং পাকিস্তান কি। কিন্তু সমস্ত ঘটনা সম্পর্কে তারাও বিশেষ কিছু জানে না। খবরের কাগজ থেকে সমস্ত ঘটনা আঁচ করা সম্ভব নয় । আর পাহারাদার সিপাইরাও অজ্ঞ এবং তাদের ব্যবহার ভীষণ রুক্ষ। ওদের আলাপ-আলােচনা থেকে কোন কিছুই বেরিয়ে আসে না। তারা কেবল এতটুকুই জানে মুহম্মদ আলী জিন্না নামে একজন মানুষ আছেন, যাঁকে কায়েদ-ই-আজম বলা হয়। ইনি মুসলমানদের জন্যে এক পৃথক দেশ বানিয়েছেন-যার নাম পাকিস্তান। কিন্তু এই পাকিস্তান কোথায় আছে? এর উদ্দেশ্য, প্রয়ােজনীয়তা সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। কারণ পাগলা গারদের এরা সবাই উন্মাদ। যাদের মাথা একেবারে বিগড়ে যায়নি, তাদের চিন্তা তারা পাকিস্তানে আছে, না হিন্দুস্থানে আছে। যদি হিন্দুস্থানে থাকে তবে পাকিস্তান কোথায়, আর যদি পাকিস্তানে থাকে তবে এই জায়গা কিছুদিন আগেও হিন্দুস্থান ছিল। একজন পাগলা হিন্দুস্থান পাকিস্তান, পাকিস্তান-হিন্দুস্থানের এমন চড়কি পাকের মধ্যে পড়ল যে তার মাথা আরাে বিগড়ে গেল। ঝাট দিতে দিতে সে একদিন এক গাছের ডালে বসে পাকিস্তান এবং হিন্দুস্থানের মৌলিক সমস্যার ওপর লাগাতার দু'ঘণ্টা ভাষণ দিল। সিপাইর। তাকে নীচে নামতে বললে সে আরাে ওপরের ডালে চড়ে বসল। তাকে ধমকানন এবং ভয় দেখানাে হলে সে বলল, “আমি হিন্দুস্থানেও থাকতে চাই না, পাকিস্তানেও না। আমি এই গাছের ওপরেই থাকব।”
বুঝিয়ে-সুজিয়ে তার রাগ ঠাণ্ডা করা হলে সে গাছ থেকে নেমে এসে হিন্দু এবং শিখ বন্ধুদের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। তাকে ছেড়ে এরা সব হিন্দুস্থানে চলে যাবে এই চিন্তায় তার মন দুঃখে ভরে উঠল।
এখানে একজন মুসলমান এম. এস. সি. পাশ রেডিও ইঞ্জিনিয়ার পাগল ছিল। অন্যান্য পাগলদের থেকে তার একটু বিশেষত্ব ছিল। বাগানের বিশেষ এক অংশে সে দিনভর ঘুরে বেড়াত, হঠাৎ-ই তার মধ্যে এক পরিবর্তন দেখা দিল। সে তার সমস্ত জামা-কাপড় খুলে পাহারাদারকে দিল এবং উলঙ্গ হয়ে সারা বাগান ঘুরে বেড়াতে লাগল। | চনয়ুটের এক মুসলমান পাগল, যে উন্মাদ হওয়ার আগে মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় কর্মী ছিল, হঠাৎ-ই সে স্নান-করা বন্ধ করে দিল। তার নাম ছিল মুহম্মদ আলী। একদিন সে তার জানালা দিয়ে ঘােষণা করল সে মুহম্মদ আলী জিন্না। তাকে দেখে একজন শিখ পাগল মাস্টার তারা সিং হয়ে গেল। সামনা-সামনি হলে খুনােখুনীর ভয় ছিল বলে দুর্ধর্ষ পাগলদের পৃথক পৃথক সেলে বন্ধ করে রাখা হল। | লাহােরের এক তরুণ হিন্দু উকিল, যে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে পাগল হয়েছিল সে যখন শুনল অমৃতসর হিন্দুস্থানে পড়েছে তখন তার খুব কষ্ট হল। কারণ এই শহরের এক হিন্দু তরুণীর সঙ্গে তার এক সময় প্রেম ছিল। যদিও সেই তরুণী উকিলকে আঘাত দিয়েছিল