পৃথিবীর তাবৎ রমণীকূলের মধ্যে মােনালিসার মতাে এতাে প্রচার, প্রচারনা এবং ভালবাসা বােধহয় আর কেউ পায়নি। জনপ্রিয়তার দিক থেকে ভিঞ্চির এই মানস সুন্দরী ম্লান করে দিয়েছে অনেক বাঘা বাঘা হলিউড সুন্দরীদেরকে। যৌবনের কোন না কোন সময় মােনালিসার প্রেমে পড়েনি এমন পুরুষ খুঁজে পাওয়া রীতিমত বিরল। মােনালিসার কৌতুকপ্রিয় চোখ আর ঠোটের কোনে ঝুলে থাকা এক টুকরা রহস্যময় হাসি অনেকে যুবকেরই রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। শত শত বছর ধরে মােনালিসার হাসির রহস্য উদঘাটনে ব্রতী হয়েছে অসংখ্য কবি শিল্পী এবং সাহিত্যিকেরা। তা সত্ত্বেও রহস্যময়ী মােনালিসার রহস্যময় হাসি রয়ে গেছে রহস্যের অন্তরালে। যুগে যুগে বিপুল সংখ্যক গবেষনা, সাহিত্য, কাব্য আর সঙ্গীত রচিত হয়েছে মােনালিসাকে ঘিরে। প্রেমিকেরা তাদের প্রেয়সীর মধ্যে খুঁজে পেতে চেয়েছেন ভূবনমােহিনী অপরূপা মােনালিসাকে। প্রেমিকার রসালাে ঠোটে আবিস্কার করতে চেয়েছে মােনালিসার অপার রহস্য রহস্য, চোখের গভীরে পেতে চেয়েছে। মােনালিসার অনন্য ঝিকিমিকি কৌতুক। সে কারণেই বােধহয় সব যুগেই পুরুষেরারা তাদের স্বপ্নচারিনীদের তুলনা করে এসেছে মােনালিসার সাথে। মােনালিসা হয়ে উঠেছে সৌন্দর্য আর রহস্যময়তার প্রতীক হিসাবে। কি আছে পাঁচশাে বছর আগে ইতালীয় রেনেসার শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা মােনালিসার মধ্যে যে যার কারণে তাকে নিয়ে এতাে উন্মাদনা, এতাে আগ্রহ, এতাে ভালবাসা, এতাে প্রচার? এ রহস্যেরও সমাধান কেউ দিতে পারেনি এখন পর্যন্ত। শত শত পন্ডিত, গবেষক এবং ঐতিহাসিকেরা পৃথিবীর দূর দূরান্তের লাইব্রেরীতে গিয়ে পুরনাে দলিলপত্রে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন মােনালিসার রহস্য উদ্ধার করার জন্য।রহস্য এবং গােপনীয়তায় আচ্ছন্ন এই প্রতিকৃতিটি আকা হয়েছে ৭৭x৫৩ সেন্টিমিটার বৃহৎ পপলার প্যানেলে। এতে কোন স্বাক্ষর ছিল না এবং কোন তারিখও দেয়া নেই। লিওনার্দোর অন্য সব ছবির ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে সেগুলাের স্কেচ বা ছবিটি সম্পর্কে কিছু বর্ণনা লিওনার্দো তার নােটবুকে লিখে রেখেছেন। কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তার হাজার হাজার পৃষ্ঠার নােটবুকে মােনালিসা সম্পর্কে একটি লাইন বা কোন স্কেচ পাওয়া যায় নি। ঐতিহাসিকেরা মােটামুটি একমত যে, লিওনার্দো তার শেষ বয়সে মােনালিসা এঁকেছেন তবে ঠিক কত সালে মােনালিসা আঁকা হয় সে বিষয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন যে ১৫০৬ সালে মিলানে ফিরে আসার আগ ফ্লোরেনসে আঁকা হয়েছে। আবার অন্যেরা দাবী করেন যে ছবিটি হয়তাে ফোরেনসে আঁকা শুরু হয়েছে কিন্তু শেষ হয়েছে কয়েক বছর পর মিলানে। শুধু কোন সময়ে আঁকা হয়েছে তাই নয়, ঐতিহাসিকেরা এটাও জানারও চেষ্টা করেছেন যে কেন লিওনার্দো এই প্রতিকৃতিটি আঁকতে গেলেন। কেউ কি তাকে এটা করে দিতে বলেছিল? যদি তাই হয়, তবে কে সে? লিওনার্দো তার অন্য সব চিত্রকর্মই বায়নাকারীদের দিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু মােনালিসার ক্ষেত্রেই তার একমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেছে। তিনি এটাকে তার সাথেই রেখে দিয়েছিলেন দীর্ঘদিন। কেন এটা বায়নাকারীকে কখনােই দেওয়া হয়নি? এই সমস্ত প্রশ্নের কোন সদুত্তর এখনাে পাওয়া যায়নি। আদিতে এই ছবিটি এখনকার তুলনায় আকৃতিতে বেশ খানিকটা বড় ছিল। ছবিটির দুইপাশের দু’টো কলাম বা পিলার কেটে ফেলা হয়েছে। একারনেই এখন ছবি দেখে সহজেই বােঝা যায় না। যে মােনালিসা আসলে টেরাসে বসে ছিল।আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া এবং মােনালিসার কিছু কিছু অংশ পরবর্তীতে রং করার কারণে বর্তমানে ছবিটির অনেক আনুসঙ্গিক বিষয়ই দৃশ্যমান নয়। তা সত্ত্বেও ছবিটির মূল বৈশিষ্টসমূহ ঠিকই অক্ষুন্ন রয়েছে।মােনালিসা সেই সময়ের জন্য ছিল অনন্যসাধারণ । যারা মােনালিসা দেখেছেন তাদের কাছে মনে হবে যেন কোন প্রতিকৃতি নয়, পুরােপুরি জীবন্ত এই মহিলা। ঠোটের কোনে রহস্যময় এক চিলতে হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে দর্শকের দিকে। ক্ষণে ক্ষণে আবার এই হাসির রূপও বদলে যায়। কখনাে এই হাসিকে মনে হয় নিস্পাপ, বর পবিত্র আবার কখনাে বা মনে হয় বিদ্রুপ করছে আশেপাশের সবাইকে। আবার কখনাে বা মনে হয় কোন হাসিই নেই তার ঠোটে। জীবন্ত কাউকে যে পুরে রাখা হয়েছে ক্যানভাসে। এক্ষুনি হয়তাে বের হয়ে আসবে ক্যানভাস ছেড়ে। আর দশটা জীবন্ত মানুষের মতই মনে হয় যেন তার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। সে কি চিন্তা করছে বা তার অনুভূতি কি তা বলা মহা দুঃসাধ্যের কাজ। সে কি আনন্দিত নাকি বিষাদগ্রস্থ, ধূর্ত নাকি সহজ সরল, শান্ত সমাহিত। নাকি পারিপার্শ্বিক সব কিছু থেকে উদাসীন কোন নারী? যারাই মােনালিসার ছবি দেখেছেন তারা কেউই একমত হতে পারেননি। প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন ভাবে মােনালিসার মেজাজ মর্জিকে ব্যাখ্যা করেছেন।ফুমাটো (Sfumato) কৌশলভিঞ্চি তার এই পােট্রেটে যে কৌশলে এই রহস্যময়তা এনেছেন তাকে বলা হয় ফুমাটো কৌশল বা পদ্ধতি। এই ইটালিয়ান শব্দটির মানে হচ্ছে ধোঁয়াশা বা ঝাপসা। তার সময়ের অন্যান্য শিল্পীরা যেখানে সুস্পষ্ট বহিরেখা ব্যবহার করতেন সেখানে ভিঞ্চি এই ক্ষেত্রে তার বিপরিতটা করেছিলেন। মােনালিসার দেহের প্রান্তসীমাসমূহ, তার সামগ্রিক মুখমন্ডল, হাতদ্বয় এবং কাপড়ের রয়েছে হালকা প্রান্তসীমা। এই প্রান্তসীমাসমূহ ঘিরে থাকা আলাে বা ছায়ার মধ্যে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেছে। আলাে এবং ছায়ার মধ্যে অদৃশ্য উত্তরন, কখনাে কখনাে বিভিন্ন রং এর কোন দৃশ্যমান চিহ্ন ছাড়াই একের সাথে অন্যের মিশে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি সবকিছুকেই ধােয়ার মত মিশিয়ে দিয়েছেন তিনি কোন প্রান্তসীমা ছাড়াই। যে কোন প্রতিকৃতির অভিব্যক্তি মূলত নির্ভর করে দুটি বিষয়ের উপর, মুখের এবং চোখের প্রান্ত। কিন্তু মােনালিসায় লিওনার্দো সচেতনভাবেই এই দূটি জায়গাকেই হালকা ছায়ার সাথে অন্তলীন হওয়ার সুযােগ করে দিয়ে অস্পষ্ট করে রেখেছেন। একারনে আমরা কখনােই নিশ্চিত না যে মােনালিসা কোন মেজাজে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তার অভিব্যক্তি সবসময়ই দর্শককে বিভ্রান্তির মধ্যে রেখে দেয়। তবে শুধুমাত্র অস্পষ্টতাই এই এফেক্ট তৈরি করেনি। এর পিছনে আরাে অনেক কিছুই আছে। লিওনার্দো অত্যন্ত দুঃসাহসী একটা কাজ করেছিলেন যা শুধুমাত্র তার মত অসম্ভব প্রতিভাবানরাই করতে পারে। মােনালিসাকে খুব ভাল করে খেয়াল করলে
Edition ccccccccccccccccccc
Published On 28/12/2021
Author ফরিদ আহমেদ