দেশে হাহাকার পড়েছে; কারণ নাকি খােরাকির অভাব । সে হাহাকার অবশ্যি ভদ্রলােকেরা শুনতে পাননি। ভাগ্যিস অভুক্ত হতভাগ্যদের গলায় চিৎকার করে কাঁদবার শক্তি নেই ।
কিন্তু অভুক্ত কংকালসার আধ-ল্যাংটা হাজার হাজার নর-নারী প্রাসাদশােভিত রাজধানীর রাস্তাঘাটে কাতার করছে। তাতে রাস্তার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। এইসব রাস্তায় আগে-আগে গাউন শাড়ী পরা পরীর ভিড় হতাে। আর আজ কিনা সেখানে অসুন্দর অসভ্য কুৎসিত অধোলংগ স্ত্রীলােকেরা ভিড় করছে! কি অন্যায়। | ভদ্রলােকেরা এটাও বরদাশত করতেন। কিন্তু যুদ্ধের জন্য পেট্রোলের অভাব হওয়ায় অনেক ভদ্রলােককে ট্রামে চড়তে হচ্ছে। ট্রামে অসম্ভব ভিড় হওয়ায় অনেক ভদ্রলােককে ফুটপাথেও চলতে হচ্ছে। এইসব অভুক্ত কুৎসিত দুর্গন্ধময় অসভ্য লােক ভদ্র লােকদের চলাফেরার ব্যাঘাত জনাচ্ছে। রাস্তায় চলতে গেলে এইসব ময়লা কুৎসিত লােকেরা গা ঘেঁষে চলতে হয়। আর চলবারই কি জো আছে? কি দুর্গন্ধ! হভাগারা ডাস্টবিনে খােরাকির তালাশ করতে গিয়ে হাতাহাতি মারামারি করে মরছে মরুক। কিন্তু ডাস্টবিনের ময়লা ছড়িয়ে রাস্তাঘাট বিচ্ছিরি ও নােংরা করবার অধিকার ৩াদের কে দিয়েছে?
শুধু কি তাই? হতভাগারা কি মরবার আর জায়গা পায়নি? মরবে কি ভদ্রলােকদের প্রশাদের দরজায়? কি মুসলি? মরা লাশের জ্বালায় ঘর থেকে কি বেরুবার উপায় আছে? বাজার থেকে একটু চিনি-কলা মিঠাই কিনে রওয়ানা হয়েছে ত আর রক্ষে নেই। হতভাগারা ছোঁ মেরে কেড়ে নেয় না বটে, কিন্তু যেভাবে দলে-দলে “বাবু ভিক্ষে দাও"
বলে চারিদিকে ভিড় করে তাতে ভয় হবার কথা নয়? যদিই বা বেটারা কখন গায়ে হাত দিয়ে বসে।
কোথাও মােটর বা ট্রাম থামলে চারদিকে হতভাগা ও হতভাগিণীরা যেভাবে গার উপর পড়ে “ভিকে দাও” বলে জ্বালাতন করে, তাতে একেবারে ঘেন্না ধরে যায়। কি উৎপাত!
অতএব ভদ্রলােকেরা পড়েছেন বিষম বিপদে। অফিসে-আদালতে থিয়েটারেবায়স্কোপে স্বাধীনভাবে চলাফেরা একরূপ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কাজেই এর প্রতিকারের জন্য একটা কিছু করতেই হবে। সেটা কি?
দ্রলােকেরা বরাবর যা করে থাকেন, তাই। করাও হল তা। অর্থাৎ সভা ডাকা হল। এ দেশে দেশদ্রোহিও দেশােদ্ধারের জন্য স্বাধীনতা সম্মিলনী ডাকেন; দজ্জাল স্বামীরাও নারীরক্ষার জন্য নারী-সম্মিলনীতে সমবেত হন; চামড়ার ব্যাপারীরাই গােহত্যা বন্ধের জন্য কাউ-কনফারেন্সের প্রধান উদ্যোক্তা। অতএব দেশের বড়লােকেরা অন্নহীনদের বাঁচাবার জন্য ফুড কনফারেন্সের আয়ােজন করলেন।
(২)
কনফারেন্স বসল টাউনহলে। ঘােড়দৌড়ের মাঠ থেকে মেট্রোলাইট হাউস গ্যাওহােটেল ফার্পো এবং গ্রেট ইস্টার্ণের সামনে থেকে অনেক মােটর এসে টাউনহলের সামনে দাঁড়াল। টাউনহল লােকে ভরে গেল। | সভাপতি হলেন শেরে-বাংলা। শেরে-বাংলার উভয় পাশ ঘেঁষে মঞ্চের উপর বসলেন সিংগিয়ে বাংলা, মহিষে-বাংলা, গরুয়ে বাংলা, টটুয়ে-বাংলা, গাধায়ে বাংলা, খচ্চরে-বাংলা, কুত্তায়ে-বাংলা, পাঠায়ে বাংলা, বিল্লিয়ে বাংলা, বেজিয়ে বাংলা, শিয়ালে বাংলা, খাটাসে বাংলা, বারে বাংলা এবং আরও অনেক নেতা। এছাড়া ইন্দুরে বাংলা, ‘হায়ে বাংলা, ফড়িং-এ বাংলা, পােকায়ে-বাংলা, মাকড়ে বাংলা এবং চিউটিয়ে বাংলারাও বাদ যাননি। তারাও মঞ্চের দু'পাশে ও সামনে চেয়ার পেতে সভা উজালা করে বসেছেন। হাতীয়ে-বাংলা অতিরিক্ত মাত্রায় কলার রস খেয়ে বিভাের হয়ে পড়েছিলেন। তাই তিনি স্বয়ং আসতে না পেরে বাণী পাঠিয়েছেন।
সবার আগে সভাপতির ভাষণ হল। সম্প্রতি তিনি ওযারতির গদি হারিয়েছেন। তার দুশমনরা ওযারত দখল করেছেন। কাজেই তিনি কনফারেন্সের উদ্দেশ্য বুঝতে গিয়ে প্রথমেই বললেন: হবে না দেশে খাদ্যের অভাব? মরবে না বাঙালি অনাহারে এমন নিমকহারাম জাত দুনিয়ায় আর একটি আহে? আমি এই হতভাগাদের এত উপকার করলাম; নিজের কামাই করা পঞ্চাশ লাখ টাকা হতভাগাদের সেবায় খরচ করে ফেললাম; অথচ তাদেরই চোখের সুমুখ দিয়ে আমার দুশমনরা আমার ওযারতি কেড়ে নিয়ে গেল; বাঙালি জাত কিনা সেটা বরদাশত করল। তারা কিনা আমার
এইবার দাঁড়ালেন সিংগীয়ে-বাংলা। সভাপতির দিকে পলকে দৃষ্টি বিনিময় করে তিনি মেঘ গর্জনের সুরে বললেন: আপনারা নাহক চেঁচামেচি করে সভা পন্ড করবেন না। আপনারা মাননীয় সভাপতির কথা বুঝতে পারেননি। তিনি অন্য সব দল বাদ দিয়ে ধু নিজের দলের লােক দিয়েই ওযারত গড়তে চান, এমন কথা তিনি বলেন নি। তার বক্তৃতার সারকথা এই যে, কোনাে একদল ওযারতের গদি দখল করে থাকলে তাতে খাদ্য-সমস্যার সমাধান হবে না। খাদ্য সমস্যার সমাধান করতে হলে সকল দলের মিলিত ওষতি গড়তে হবে অর্থাৎ কিনা ন্যাশনাল কোয়ালিশন গভর্ণমেন্ট বানাতে হবে। এতে কারুর আপত্তি হবার কোন কারণ নেই।
সভা এটকু ঠাণ্ডা হল। সিংগীয়ে বাংলা আসন গ্রহণ করলেন। ঠাণ্ডা হল মানে একেবারেই ঠাণ্ডা। সভায় আর তেমন উৎসাহের বিদ্যুৎ চমকালাে । এই না দেখে সভ্যমণ্ডলীর মনে উৎসাহের বিজলী চমকাবার উদ্দেশ্যে বন্ধুরা বিখ্যাত বক্তা কুত্তায়ে-বাংলাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
কুত্তায়ে বাংলা পিছনের পায়ে ভর করে সােজা হয়ে দাঁড়ালেন এবং গলা সাফ করার কায়দায় দুটো বড় রকমের ঘেউ ঘেউ মেরে সভা কাঁপিয়ে তুললেন। তারপর বলতে শুরু করলেন: সিংগীয়ে-বাংলা যা বলেছেন, ঠিকই বলেছেন। আমি জানি, শেরে বাংলারও তাই মত। আর হবেই বা না কেন? এটা তাে অতি সহজ কথা । যার মাথায় এক ছটাক বুদ্ধি আছে, তিনিই এ সােজা কথাটা বুঝতে পারবেন। একটি মাত্র দল-তা তাঁরা যতই শক্তিশালী, আর যতই বড় হােক না কেন-দেশের সব লােক হতে পারেন না। ফলে একটি মাত্র দল যদি ওরতি করে, তবে তাতে ঐ দলের সকলের খাদ্য সমস্যার সমাধান হল, এটা ঠিক। কিন্তু যে-সব দল ওরতি থেকে বাদ পড়ল, তাদের খাদ্য-সমস্যার কি হবে? অথচ যদি সকল দল মিলেমিশে ওযারতি করে, তবে সবারই খাদ্য সমস্যা মিটতে পারে। একেই বলে কোয়ালিশন। এই সহজ সত্যটা যিনি বুঝতে পারেন না, তার বুদ্ধিতে শত ধিক্।
| কুত্তায়ে-বাংলার বক্তৃতায় সভায় ধন্য ধন্য পড়ে গেল। চারদিকে গর্বিত দৃষ্টি ফিরিয়ে কুত্তায়ে-বাংলা আসন গ্রহণ করলেন।
সভার বেশির ভাগ লোেক শেরে-বাংলার পক্ষে চলে যা েদেখে ওরিদের পক্ষ থেকে গাধায়ে-বাংলা বিকট গলায় চিৎকার করে দাঁড়িয়ে উঠলেন। তিনি বললেন: শেরে-বাংলার দু দ্বাজ যে বড় সর্বদলীয় কোয়ালিশন গভর্ণমেন্টের পক্ষপাতী হয়ে উঠেছেন, দুদিন আগে তাঁর এ মত ছিল কোথাও? তিনি যখন আমাদের বাদ দিয়ে ওযারত গঠন করেছিলেন, তখন আমাদের খাদ্য সমস্যার কথাটা বিবেচনা করেছিলেন কি? সে ওযারত টিকিয়ে রাখবার প্রাণপণ চেষ্টা কি তিনি করেন নি? তিনি তার ও্যরত বাঁচিয়ে রাখবার জন্য অত চেষ্টা যদি করে থাকতে পারেন, তবে আমরাই বা তা করতে পারব না কেন? আর কুত্তায়ে-বাংলা যে বললেন: আমাদের ওযারত হওয়ায় ও আমাদের দলেরই খাদ্য সমস্যা মিটিছে, এটা সত্য নয়। আমরা শেরে-বাংলার ওযারতের চেয়ে বেশি লােককে ও্যারতে নিয়েছি। আর যাদের ওযির বানাতে পারিনি,
৩াদের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি করেছি। তাছাড়া কন্ট্রাক্ট ও নমিনেশনাদি দিয়ে অনেক লােককে ওয়ারতের খুঁটি বানিয়েছি। এতে আমাদের সকলের ভাগ্যেই খাদ্য কম পড়ে গিয়েছে। তাতে করে আমরা কায়ক্লেশে কোন প্রকারে ওআরতির গাড়ী ঠেলে নিয়ে যাচ্ছি। তার উপর অন্য দলের লােককেও যদি ওযারতে ঢুকতে দেই তবে রাস্তার লােক Aাবার আগেই আমরা ওযির-নাযির না খেয়ে মরব।
গাধায়ে-বাংলার চোখে আঁস দেখা দিল। কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র না দমে তার সতায় বাধা দিয়ে পাঠায়ে-বাংলা বললেন; ওযিরি করে যদি আপনাদের খাদ্য-সমস্যা মিটছে না, তবে ওযারতি ছেড়ে দিন না; নাহক ওখানে বসে-বসে আর কষ্ট করছেন কেন? | গাধায়ে-বাংলা গর্জন করে উঠলেন: কষ্ট করছি কি আর সাধে? আমরা ওযারতি গদি ছেড়েছি কি, আর অমনি আপনারা তাতে লাফিয়ে চড়ে বসবেন। সেই চিন্তাতেই তাে এ আপদ ছাড়তে পারছিনে, এত কষ্ট করেও তাই এ মরা আগলে বসে আছি । আপনাদের সামনে আজ তিন সত্যি করে বলছি, থাকবও বসে সেখানে আপনাদের পথরােধ করে। যদি গদিতে বসে অনাহারেও থাকতে হয় গদিতেই জান দেবাে। এনাহারেই যদি মরতে হয়, তবে রাস্তায় পড়ে মরার চেয়ে ওযারতির গদিতে পড়ে মরা অনেক ভাল।
সভা স্তম্ভিত হল। শেরে-বাংলার তালু জিভ লেগে গেল। ওই যদি দুশমনদের অাটিচুড হয়, তবে আর আপসের সম্ভাবনা কোথায়? তবে আর তার দলের লােকদের খাদ্য-সমস্যার সমাধান হবে কি করে? এ সব ফুড কনফারেন্স করে তবে লাভ কি? পাশের লােকদেরে স্তোক দিয়ে রাখাই যায় আর কতকাল?
তিনি রেগে যাচ্ছেন দেখে সিংগীয়ে-বাংলা চোখ ইশারায় তাকে থামতে বলে পুরে-বাংলার কানে-কানে কি বললেন। ইন্দুরে-বাংলা চেয়ারের উপর চড়ে বলতে লাগলেন; বাঘে-মােষে লড়াই হয়, নলখাগড়ার পরাণ যায় । আমাদের হয়েছে তাই। যা দেখছি তাতে বাঘে-মােষে আপােস হবে না। তবে আর আমরা গরীব লােকেরা কেন
কি অদের তাে কাম-কাজ রয়েছে। রাত অনেক হয়েছে। রাতের বেলা আমাদের গকে লােকের কথা-বালিশ কাটতে হবে। নইলে তাে আর আমাদের খােরাকি জুটবে • । কাজেই আসুন ভাই সাহেবান, আমরা সভ্য ছেড়ে চলে যাই।
এই কথায় সভার অনেকেই উঠবার আয়ােজন করল।
মহিষে-বাংলা এতক্ষণ কথা বলেননি। সভাপতির একটু দূরে একটা বড় রকমের সোফায় কাৎ হয়ে পড়ে তিনি এতক্ষণ জাবর কাটছিলেন।
সড়া পণ্ড হয় দেখে তিনি এইবার উঠে দাঁড়ালেন। বললেন: আমি একটা আপােসপার করছি। আশা করি শেরে-বাংলার দল তা গ্রহণ করবেন। অনেক সাধ্যি-সাধনা • আমরা ওযারতি দখল করেছি; ওটা আমরা ছাড়তেও পারব না, অন্য কাউকে