রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় প্রথম প্রথম ইসলামের দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করেন, মক্কার পৌত্তলিকরা একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর ওপর। নির্যাতনের সকল পন্থায় তিনি এবং তাঁর অনুসারীদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। ঠিক এ সময়ে রাসুলের পাশে এসে দাঁড়ান মক্কার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহু । শুধু পাশেই দাঁড়ালেন না, তিনি রাসুল ও ইসলামের সত্যায়ন করে কালিমা পড়ে মুসলিম হয়ে গেলেন। এ ঘটনা রাসুলকে নতুন ধর্ম প্রচার ও প্রসারে নতুন করে উদ্দীপ্ত করে।
সুতরাং রাসুলের জীবনের অন্যতম অভয়াশ্রয় হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত তাঁকে নিদারুণ ব্যথিত করে। তিনি উহুদের প্রান্তরে হামজার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ঘোষণা করেন-হামজার হত্যাকারীকে কখনো ক্ষমা করা হবে না। যেখানেই তাকে পাওয়া যাবে সেখানেই তাকে হত্যা করা হবে।
এই হত্যাকারীর নাম ছিল ওয়াহশি। মক্কার কুরাইশনেতা জুবাইর ইবনে মুতইমের ক্রীতদাস ।
রাসুলের ওফাতের পর আবু বকর মুসলিম জাহানের খলিফা নিযুক্ত হলেন। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই খবর এল, বিভিন্ন গোত্র ইসলাম ত্যাগ করেছে। তিনি তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেন। ওয়াহশির ভাগ্যে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের সঙ্গে ইয়ামামায় অভিযানের দায়িত্ব পড়ল ৷ সেখানে মুসায়লামাতুল কাজ্জাব রিসালাতের ক্ষেত্রে নবীজির অংশীদার বলে দাবি করেছে। বড় এক ফিতনা হয়ে আবির্ভূত হয়েছে সে। তার বিরুদ্ধে অভিযানে হাজার হাজার মুসলিম শাহাদাতবরণ করেছেন। ওয়াহশি সেই জিহাদে অংশগ্রহণ করলেন। তিনি ছুটছিলেন আর বলছিলেন, 'হ্যাঁ, এ সফরের কোনো শেষ নেই । আল্লাহর নুরকে নিভিয়ে দিতে চায় এমন একটা লোককেও আমরা ছাড়ব না। মানবতার মুক্তি আমরা ছিনিয়ে আনবই।'
ইয়ামামার ময়দানে তখন তুমুল যুদ্ধ চলছে। ওয়াহশি বর্শা হাতে এদিক- সেদিক নজর বুলাচ্ছেন। হঠাৎ তিনি চুল এলোমেলো এক লোককে উঁচু পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলেন। লোকটা যুদ্ধের মতিগতি বোঝার চেষ্টা করছে। ওয়াহশি চিৎকার দিয়ে বললেন, 'ওই দেখো মুসায়লামাতুল কাজ্জাব।'
চোখের পলকেই তিনি তাকে বর্শার নিশানা বানালেন। এটা তাঁর সেই বর্শা, যেটা দিয়ে তিনি হামজাকে হত্যা করেছিলেন। তিনি মুসায়লামার বুক বরাবর নিশানা ঠিক করলেন। তার হাত থেকে শাঁ করে বেরিয়ে গেল বর্শা। অব্যর্থ নিশানা। মিথ্যুক জালিমটাকে একদম এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেল ওয়াহশির বর্শা। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে। তারপর একজন মুসলিম সৈনিক তার মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করে ফেললেন ।
রণাঙ্গনে মহাসত্যের বিজয় হলো। ওয়াহশি বসে বসে তাঁর বর্শাটা দেখছিলেন আর বলছিলেন, ‘এ বর্শা দিয়েই আমি আল্লাহর রাসুলের পর দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে হত্যা করেছিলাম। আজ এটা দিয়েই সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ মুসাইলামাকে খতম করলাম।' যুদ্ধের ধকলে ক্লান্ত ওয়াহশির চোখ তন্দ্রায় বুজে এল। ঘুম তিনি সীমাহীন আনন্দবোধ করলেন। খুশিতে উজ্জ্বল চেহারা। তিনি চিৎকার করতে শুরু করলেন, আল্লাহু আকবার...আল্লাহু আকবার...।' একজন মুজাহিদ এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল ‘ওয়াহশি! আপনার?' কী হলো তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। চোখে-মুখে অনাবিল আনন্দের দ্যুতি । ‘আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখেছি। তিনি একটা সাদা ঘোড়ায় বসে আছেন। আমাকে দেখে মুচকি হাসছেন। আমি তাঁকে দেখে ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলেন। চুমু খেলেন আমার কপালে। তারপর বললেন, আমি আর তিনি একসঙ্গে অবস্থান করব জান্নাতে ।’