বিশ্বের সর্ববৃহৎ ছয়টি ধর্মের মধ্যে সময়ের দিক থেকে সর্বকনিষ্ঠ, কিন্তু অনুসারীদের সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় বৃহৎ ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় একশত পঞ্চাশ কোটি এবং দেশ হিসেবে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশ ব্যাপী বিশাল এলাকায় বিস্তৃত ৫৭টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের কথা বাদ দিলেও বিশ্বের অবশিষ্ট প্রায় সকল দেশেই কমবেশী ইসলামের অনুসারী রয়েছে। খ্রিষ্ট ধর্মের প্রায় ছ’শত বছর পরে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব। আরবের মক্কা নগরে কোরেশ বংশে জন্ম নেয়া বিশ্বের সর্বাধিক সফল এবং প্রভাবিত মহামানব হজরত মুহম্মদ স. (৫৭০-৬৩৩) ৬১৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এই ধর্ম প্রচার করেন।
আরবে তখন চলছিল অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও শোষণ ও নিপীড়নের এক অন্ধকার যুগ যাকে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বলা হয়। আরবের সমাজব্যবস্থা ও ধর্মীয় জীবন নিয়ন্ত্রিত হত বহু দেবদেবীর দ্বারা। মক্কার মূল উপাসনাগারে ছিল ৩৬০টি দেবদেবীর মূর্তি। একেকটি মূর্তি একেকটি গোষ্ঠীর ভাগ্যের প্রতিরূপে চিহ্নিত হত। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল লাত, মানাত ও উজ্জা। এই অন্ধকার থেকে মুক্তির উপায় সন্ধানকল্পে হজরত মুহম্মদ (দ.) পবিত্র হেরা গুহায় আল্লাহর ধ্যানে আত্মনিয়োগ করেন। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ৪০ বছর বয়সের সময় তিনি স্বর্গীয় দূত জিবরাইলের মাধ্যমে আল্লাহর ঐশী বাণী বা ‘ওহী’ প্রাপ্ত হন। এই ঐশী নির্দেশাবলিই পরবর্তীকালে ইসলাম ধর্মের মূল বিধান হিসেবে গ্রন্থাকারে পবিত্র কুরআন হিসেবে সন্নিবেশিত হয়।
১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২রা এপ্রিল (১৩৩২ বঙ্গাব্দে ১৯শে চৈত্র, শুক্রবার) কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এই দাঙ্গায় মর্মাহত হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম ‘গণবাণী’ পত্রিকায় দুই পর্বে দুটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রথমটি ‘মন্দির ও মসজিদ’ দ্বিতীয়টি ‘হিন্দু-মুসলমান’। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে রচিত দুটি প্রবন্ধের মানবিক আর্তি এতই করুণ এবং বেদনাবিদূর হয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে যে সমকালীন জনমানসের সেই নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা এখনো আমাদের চৈতন্যে আঘাত করে। ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধের শুরুতেই দাঙ্গার চিত্রে আমরা দেখি :
‘মারো শালা যবনদের!’ ‘মারো শালা কাফেরদের!’— আবার হিন্দু মুসলমানী কাণ্ড বাঁধিয়া গিয়াছে। প্রথমে কথা-কাটাকাটি, তারপর মাথা-ফাটাফাটি আরম্ভ হইয়া গেল। আল্লার এবং মা কালীর ‘প্রেস্টিজ’ রক্ষার জন্য যাহারা এতক্ষণ মাতাল হইয়া চিৎকার করিতেছিল তাহারাই যখন মার খাইয়া পড়িয়া যাইতে লাগিল, দেখিলাম-তখন আর তাহারা আল্লা মিয়া বা কালী ঠাকুরানীর নাম লইতেছে না। হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি পড়িয়া থাকিয়া এক ভাষায় আর্তনাদ করিতেছে,– ‘বাবা গো, মা গো!’—মাতৃ পরিত্যক্ত দুটি বিভিন্ন ধর্মের শিশু যেমন করিয়া এক স্বরে কাঁদিয়া তাহাদের মাকে ডাকে। দেখিলাম, হত-আহতদের ক্রন্দনে মসজিদ টলিল না, মন্দিরের পাষাণ দেবতা সাড়া দিল না। শুধু নির্বোধ মানুষের রক্তে তাহাদের বেদী চিরকলঙ্কিত হইয়া রহিল। (কাজী নজরুল ইসলাম, ‘মন্দির ও মসজিদ’)।
আসলে ধর্ম ধারণ করার জিনিস, জয় করার জিনিস। কিন্তু এটাকে ভীষণ ভয়ের বিষয় বানিয়ে তোলা হয়েছে উদ্ভটভাবে। এর মাধ্যমে উপভোগ্য আনন্দের উৎসকে দুঃখময় কৌরব নরকের দুর্ভোগে নির্বাসিত করেছে রাজসিক আনুষ্ঠানিকতার মোড়লেরা। আল্লাহর নিজের কোন পক্ষপাত ধর্ম নেই।[২২] তিনি সব ধর্মশিখরের উপরে উঠে একাসনে বিরাজমান। তিনি সকল সৃষ্টির বন্ধনে সমান করুণাময়ী। ধর্মই মানুষকে সৃষ্টির গিটে গিটে আটকে ফেলেছে। সমস্ত সৃষ্টিজগতটাই বিচিত্ৰ দৃশ্য ও অদৃশ্য সম্বন্ধসুতোর গিট তথা বন্ধনের সমাহার যাকে সম্যক ধর্মবিজ্ঞানীরা বলেন, মনের চৌম্বক আকর্ষণী ক্ষেত্র ‘মোহবন্ধন’। কোমল কিন্তু সূক্ষ্ম কঠিন ও গিট্টগুলো যিনি এক এক করে ভেতর থেকে খুলে ফেলতে পেরেছেন তিনি আর আমাদের মত রক্তমাংস বন্দি সামান্য বা সাধারণ মাটির মানুষ নয়, আকাশের মত বিশাল হৃদয় মুক্তমহাপুরুষ। তিনি যেদিকে মোড় নেন ধর্মকে সেদিকে মোড় ফেরাতেই হয়। সমস্ত ধর্মের ঊর্ধ্বে ওঠে তিনি তখন হয়ে ওঠেন মুক্তধর্মী। এই মুক্তধর্মীদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতে পারে ধর্মমুক্তির সুচারু পথ ও পদ্ধতি। ধর্মমুক্তির সুচারু পথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথিক ছিলেন নজরুল। ধর্মবোধের অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে এমন সোচ্চার প্রতিবাদী কণ্ঠ বাঙালি সমাজে দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত নেই।
[২২. কুরআনে উল্লেখিত ‘ইন্না দ্বীনা এনদাল্লাহিল ইসলাম’ (৩ : ১৯ এর অংশ)। অর্থাৎ- নিশ্চয়ই ইসলাম আল্লাহর নিকটবর্তী দ্বীন। উল্লেখ্য অধিকাংশ অনুবাদে দেখা যায়— ‘নিশ্চয়ই ইসলাম আল্লাহর মনোনীত ধর্ম’। এখানে ‘নিকটবর্তী’ অর্থের পরিবর্তে ‘মনোনীত’ অনুবাদে এই তাৎপর্য ইঙ্গিত দেয় যে, ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মের মনোনয়ন আল্লাহ অনুমোদন করেননি। এ ধরনের অনুবাদে শুধু স্বাতন্ত্র্য সম্প্রসারিত হয়— শান্তি প্রতিষ্ঠা পায় না!]
বাঙালি সমাজের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রধান প্রতীক পুরুষ কাজী নজরুল ইসলাম সমকালেই অভিহিত হয়েছিলেন ‘যুগমানব’ অভিধায়। নজরুলের মধ্যে মূর্তমান হয়ে উঠেছিল যুগমানবের সম্মিলিত মানবচেতনা। নজরুলের মত এতটা অসাম্প্রদায়িক, এতটা উদারনীতিবাদী, এতটা মানবতাবাদী মানস চৈতন্যের অধিকারী মানুষ বাঙালি সমাজে তুলনা রহিত। হিন্দু-মুসলমান এই দুটি সম্প্রদায়ের মনোজগতের দূরত্ব নিরসনে নজরুল নিজেও তাঁর রচনায় মানবিক উষ্ণতায় সহনীয় শব্দ প্রয়োগ করে হিন্দু-মুসলমানের আলিঙ্গনের পথকে সহনীয় করে তুলতে চেয়েছিলেন। এ সময়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন,
‘আমি হিন্দু’ ‘আমি মুসলমান’ এ কথা শুনতে শুনতে কান ঝালা-পালা হয়ে গেল। কিন্তু ‘আমি মানুষ’ এ কথা কাহাকেও বলতে শুনি না। যারা মানুষ নয়, তারা হিন্দু হোক আর মুসলমান হোক, তাদের নিয়ে জগতের কোন লাভ নেই।’ (প্রতিধ্বনি, চৈত্র ১৩৭৭)।
কিন্তু আমার জীবন রয়ে গেল বিশুদ্ধ মরুভূমির কথা—আমার ছেলে মারা গেছে, আমার মন যখন তীব্র পুত্রশোকে ভেঙ্গে পড়েছে ঠিক সেই দিনে সেই সময়ে আমার বাড়িতে হাস্নাহেনা ফুটেছে। আমি প্রাণভরে সেই হাস্নাহেনার গন্ধ উপভোগ করেছিলাম। আমার কাব্য আমার গান আমার জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে। যদি কোনদিন আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকীত্বের পরম শূন্য হতে অসময়ে নামতে হয় তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন না আমি সেই নজরুল; সেই নজরুল অনেকদিন আগে মৃত্যুর খিড়কি দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে। মনে করবেন পুণ্যার্থের তৃষা নিয়ে যে একটি অশান্ত তরুণ এই ধরায় এসেছিল অপূর্ণতার বেদনায় তারই বিগত আত্মা যেন স্বপ্নে আমাদের মাঝে কেঁদে গেল। যদি আর বাঁশি না বাজে— আমি কবি বলে বলছিনা, আপনাদের ভালবাসা পেয়েছিলাম সেই অধিকারে বলছি— আমায় আপনারা ক্ষমা করবেন আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন আমি কবি হতে আসিনি আমি নেতা হতে আসিনি, আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম। সেই প্রেম পেলামনা বলে আমি এই প্রেমহীন নীরব পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম। যেদিন আমি চলে যাব সেদিন হয়তোবা বড় বড় সভা হবে, কত প্রশংসা কত কবিতা হয়ত বেরুবে আমার নামে, দেশপ্রেমিক-ত্যাগী বীর-বিদ্রোহী বিশেষণের পর বিশেষণ, টেবিল ভেঙ্গে ফেলবে থাপ্পর মেরে, বক্তার পর বক্তা এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রাদ্ধ দিনে- বন্ধু তুমি যেন যেওনা। যদি পার চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ করো, তোমার আঙ্গিনায় বা আশেপাশে যদি একটা ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও সেইটিকে বুকে চেপে বলো, বন্ধু আমি তোমায় পেয়েছি—