সাধনা ও পরিশ্রম ব্যতীত জগতে কোন উন্নতি হয় না। কপালের জোরে লক্ষ টাকা পাবে—এ কখনো বিশ্বাস করো না। যে কোন কাজই কর না, সম্যক পারদর্শিতা লাভ করতে হলে বহু বছর সাধনা করতে হবে ।
ছোট নগণ্য ক্ষুদ্রকে ঘৃণা করো না। ক্ষুদ্রের সাহায্যেই বিরাটের সৃষ্টি। ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলি কাজে লাগালে জীবনে সোনা ফলাতে পারবে । রাতারাতি কেউ বড় মানুষ হয় না । হঠাৎ কোন সুবিধা কারো হয় না । হলেও তা বিশ্বাস করে নিজেকে দুর্বল করো না ।
যারা কাপুরুষ তারাই ভাগ্যের দিকে চেয়ে থাকে। পুরুষ চায় নিজের শক্তির দিকে । তোমার বাহু, তোমার মাথা তোমাকে টেনে তুলবে, তোমার কপাল নয় ।
একদিন দুইদিন করে জীবনের দীর্ঘ সময় চলে যাচ্ছে— জগতে যারা বড়, তাঁরা অপচয় সহ্য করবেন না ।
ওয়াট যে সময় দোকানে বসে বেচাকেনা করতেন সেই সময় তিনি রসায়নশাস্ত্র ও জার্মান ভাষা আলোচনা করে উভয় বিষয়েই পণ্ডিত হয়েছিলেন । তুমি এ কথা শুনে হয়ত বিস্মিত হবে। স্টিফেনসন ইঞ্জিনে কয়লা যোগাতেন আর অঙ্ক করতেন ।
যত সময় তুমি হাসিগল্পে ও ঠাট্টায় কাটিয়ে দাও—তার ভিতর থেকে বেশী নয়, এক ঘণ্টা সরিয়ে রাখ। সমস্ত দিনে-রাত্রে মাত্র এই এক ঘণ্টা যদি তুমি কোন কোন বিষয় আলোচনা কর দেখতে পাবে, দশ বছর পরে তুমি একজন বড় পণ্ডিত হয়েছ। বন্ধু ও সঙ্গীদের কাছে তোমার সম্মান বেড়েছে। হয়ত তুমি সমস্ত জগতের ইতিহাস জেনে ফেলেছ – অঙ্কশাস্ত্রে প্রভূত পাণ্ডিত্য লাভ করেছ, একজন বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হয়ে পড়েছ কিংবা অর্থসহ সমস্ত কোরআন শরীফ বা গীতাখানা মুখস্থ করে ফেলেছ ।
ডাক্তার ম্যাসন গাড়ীতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবার সময় একখানা বৃহৎ পুস্তক অনুবাদ করে ফেলেছিলেন। ডাক্তার ডারউইন বেড়াবার সময়েই তাঁর অধিকাংশ বই লিখতেন । ডাক্তার বার্নে গান শিখাবার জন্য যখন এক ছাত্রের বাড়ী ছেড়ে অন্য ছাত্রের বাড়ীতে যেতেন, তখন তাঁর সাথে দেখা যেত ফরাসী ও ইতালীয় ভাষার ব্যাকরণ ।
এক উকিলের কেরানী বাসা থেকে অফিসে যাবার পথে শিখেছিলেন গ্রীক ভাষা । ভাত খেতে ডাকলে ডিজুসে সব সময়েই দেরি করতেন। তার মানে, সে সময় তিনি বই লিখতেন। খাবার আগের সময়টুকুও বিনা কাজে ফেঁসে যেতে দিতেন না ।
কামার ইলিহু বুরিট দোকান ঘরের ঠকঠকির মধ্যে বসে আধুনিক ও পুরাতন ত্রিশটি ভাষায় পণ্ডিত হয়েছিলেন।
পথে যদি ৫০০ টাকা পাও তা হলে তোমার আনন্দের সীমা থাকে না। সময়রূপ অমূল্য রত্ন তোমার পায়ে জড়িয়ে পড়েছে, সেদিকে তোমার ভ্রূক্ষেপ নাই । মানুষের কাছে টাকা চাও, সে তোমাকে ঘৃণা করবে। সময় সম্পদ নিয়ে তোমার দরজায় দাঁড়িয়ে- দয়া করে তার রত্ন উপহারগুলি গ্রহণ কর ।
কতকগুলি যুবক বাক্সটারের কাছে দেখা করতে যেয়ে বলেছিল—মহাশয়! আমাদের ভয় হচ্ছে, আপনার সময় নষ্ট করছি। অভদ্র (?) জ্ঞানী বাক্সটার বললেন—নিশ্চয়ই।
কোন জাতিকে যদি বলা হয়- তোমরা বড় হও, তোমরা জাগ—তাতে ভাল কাজ হয় বলে মনে হয় না । এক একটা মানুষ নিয়েই এক একটা জাতি। পল্লীর অজ্ঞাত-অবজ্ঞাত এক একটা মানুষের কথা ভাবতে হবে ।
মানুষকে শক্তিশালী, বড় ও উন্নত করে তোলার উপায় কি? তাকে যদি শুধু বলি—তুমি জাগো -আর কিছু না, তাতে সে জাগবে না । এই উপদেশ বাণীর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত আছে। এইটে ভাল করে বোঝা চাই ।
আবার বলি—কোন জাতিকে যদি বাহির হতে বলি - বড় হও, তাতে কাজ হবে না । মানুষকে এক একটা করেই ভাবতে হবে ।
একটা লোক জাতীয় সহানুভূতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে হাজার হাজার টাকা তুরস্কে পাঠিয়েছিলেন । তিনি যখন অগণ্য আর্ত মানুষের বেদনা কাহিনী গাইতে গাইতে ভিক্ষার ঝুলি স্কন্ধে নিয়ে পথে বের হতেন তখন প্রত্যেক মানুষের প্রাণ সহানুভূতি বেদনায় ও করুণায় ভরে উঠত । এই ব্যক্তি কিছুদিন পর তার এক নিরন্ন প্রতিবেশীর সর্বস্ব হরণ করতে দ্বিধাবোধ করেন নাই । মানুষের এই ভাবের জাগরণ ও বেদনা- বোধের বেশী মূল্য আছে বলে মনে হয় না। কোন জাতির যখন পতন আরম্ভ হয়; তখন দেশসেবক যে কেউ থাকে না তা নয় । স্বাধীনতার মমতায় কেউ প্রাণ দেয় না, তা বলি না; যারা মন দেয় তাদের মন ভিতরে ভিতরে অন্ধ হতে থাকে । জাতিকে খাঁটি রকমে বড় ও ত্যাগী করতে হলে সমাজের প্রত্যেক মানুষকে বড় ও ত্যাগী করতে হবে কি উপায়ে? দেশের মানুষের ভিতর আত্মবোধ দেবার উপায় কি? প্রত্যেক মানুষ শক্তিশালী-উন্নত হৃদয়-প্রেম-ভাবাপন্ন-সত্য ও ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধাবান, অন্যায় ও মিথ্যার প্রতি বিতৃষ্ণ হবে কেমন করে? জাতির প্রত্যেক বা অধিকাংশ মানুষ এইভাবে উন্নত না হলে জাতি বড় হবে না ।
প্রত্যেক মানুষের ভিতর জ্ঞানের জন্য একটা স্বাভাবিক ব্যাকুলতা জন্মিয়ে দেওয়া চাই। সংসার এমনভাবে চলেছে, যাতে সকলের পক্ষে বিদ্যালয় বা উচ্চ জ্ঞানের যোগ দেওয়া সম্ভব হয় না । অথবা সারা ছাত্রজীবন ধরে বিদ্যালয়ে জ্ঞানলাভ করা হয়ে ওঠে না ।
কেউ বাল্যে পিতৃহীন হয়, কারো পিতা জ্ঞানালোচনাকে বিশেষ আবশ্যক কাজ মনে না করে ছেলেকে স্কুলে পাঠান না, কেউ পাঠাভ্যাস কালে উদ্ধত ও দুর্মতি হয়ে পড়াশুনা ত্যাগ করে, কেউ বিদেশী ভাষার নিষ্পেষণে বোকা ভেবে পড়াশুনা বাদ দেয় ।
পাঁচ হাজার ছাত্রের মধ্যে পঞ্চাশজন ছাড়া বাকী সব ছেলেই সময়ে জ্ঞানান্ধ, হীন ও মৌন মূক হয়ে যায় । ইহা জাতির পক্ষে কত ক্ষতির কথা ।
মনুষ্যত্ব লাভের পথ জ্ঞানের সেবা। জীবনের সকল অবস্থায় সকল সময়ে- আহার স্নানের মত মানুষের পক্ষে জ্ঞানের সেবা করা প্রয়োজন ।
উন্নত, ত্যাগী, শক্তিশালী, প্রেমিক, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধাবান মানুষ বিদ্যাহীন বা অল্পশিক্ষিত মানুষের মধ্যে পাওয়া যায় না। মানুষের বা জাতিকে বড় হতে হলে সব সময়ই তাকে জ্ঞানের সেবা করতে হবে ।
দেশের সকল মানুষকে জ্ঞানী করে তোলার উপায় কি? জাতির জীবনের মেরুদণ্ড মনুষ্যত্ব ও জ্ঞান । এই দুটি চাপা রেখে জাতিকে জাগতে বললে সে জাগবে না ।
বুদ্ধির দোষে হোক বা অবস্থার চক্রে হোক, কোন দেশে যদি বহু মানুষ অশিক্ষা, অল্পশিক্ষিত বশতঃ অমার্জিতচিত্ত এবং জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাবোধহীন হয়ে পড়ে, তাহলে সে জাতির জীবন টেকসই হবে না। এই সব লক্ষ মৌন আত্মায় স্পন্দন আনবার এক উপায় আছে, কোটিবদ্ধ মুখে ভাষা তুলে দেবার এক পন্থা আছে । সকল দেশে সকল সময়ে সেই পন্থা কার্যকরী হয়ে থাকে। সেই পন্থা না থাকলে কোন জাতি বাঁচত না—উন্নত হওয়া স্বপ্ন অপেক্ষা অসম্ভব হতো।
জাতিকে শক্তিশালী করতে প্রত্যেক সময়ে মানুষ এই পন্থা অবলম্বন করেছে। গ্রীক জাতি, রোমান জাতি, বর্তমান ইউরোপীয় জাতি—এই পথকে অবলম্বন করে শ্রেষ্ঠস্থান অধিকার করেছেন ।
যারা এই পথকে অবহেলা করে নিজদিগকে প্রতিষ্ঠিত করতে ইচ্ছা করে, তারা একটা অসম্ভব কাজ আরম্ভ করে।
এই পথ আর কিছু নয়-দেশের বা জাতির সাহিত্যের পুষ্টিসাধন । যে সমাজে সাহিত্যের কোন আদর নাই, তাহা সাধারণত বর্বর সমাজ। কথা কাগজে ধরে অসংখ্য মানুষের দৃষ্টির সম্মুখে ধরার নাম সাহিত্য-সেবা। এই যে কথা, এ কথা সাধারণ কথা নয়—এই কথার ভিতর দিয়ে জীবনের সন্ধান বলে দেওয়া হয়, পুণ্যের বাণী ও মোক্ষের কথা প্রচার করা হয়, বর্তমান ও অন্তিম সুখের দ্বার মুক্ত করে দেওয়া হয় ।
এই কথার ধারা গান ও গল্প, কখনও কবিতা ও দর্শন, কখনও প্রবন্ধ ও বিজ্ঞানের রূপ নিয়ে মানুষের সম্মুখে রঙীন হয়ে, মধুরভাবে দেখা দেয় ।
দুর্গত কণ্টকাকীর্ণ আঁধার পথে কেউ যদি প্রদীপ না নিয়ে চলতে থাকে কিংবা আলোর যে আবশ্যকতা আছে, একথা উপহাসের সঙ্গে অস্বীকার করে, তা'হলে তাকে কি বলা যায়? কোন জাতি সাহিত্যকে অস্বীকার বা অবহেলার চোখে দেখে উন্নত হতে চেষ্টা করলে সে জাতি আদৌ উন্নত হবে না ।
শিক্ষিতকে আরও শিক্ষিত, ভাবুককে আরও গভীর করবার জন্য, দেশের অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত শিক্ষাকেন্দ্রের বাহিরের লোকগুলিকে শক্তিশালী, জ্ঞানী ও মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন করবার জন্য প্রত্যেক দেশে বহু মনীষী জন্মগ্রহণ করেন ।
জাতির পথপ্রদর্শক তাঁরাই। তাঁরাই জাতি গঠন করেন। গ্রীস, আরব, হিন্দু ও ইউরোপীয় শক্তি সভ্যতার জন্মদাতা তাঁরাই ।
প্রত্যেক দেশের সাহিত্যের ভিতর দিয়ে এইসব শিক্ষিত শ্রেণী জাতিকে ঊর্ধ্বে টেনে তোলেন । ক্ষুধাতুর আর্ত তাদের স্পর্শে রাজা হয়ে ওঠে, পল্লীর কৃষক, দূর অজ্ঞাত-কুটিরের ভিখারী, জমিদারের ভৃত্য, দরিদ্র গো-যান চালক, অন্ধকারের পাপী, বাজারের দরজী, নগরের ঘড়ি নির্মাতা, নবাবের ভৃত্য, গ্রাম্য উরুটে যুবক শ্রেণী তাঁদেরই মন্ত্রে মহাপুরুষ হয় ।