ঠেলাগাড়ি থেকে ট্রাকে উত্তরণ : আবুল কালামের পুরাে সংসার এখন ট্রাকের ওপর উঠছে। আগে একটা ঠেলাগাড়ি যথেষ্ট ছিল। অমুক মহল্লা থেকে তমুক মহল্লায়, এ গলি ছেড়ে সে গলি-দশ বছরের সংসার-জীবনে মােট ছয় বার বাসা বদলের ধাক্কা এক ঠেলাতেই কেটেছে। সংসারের এসব ঠেলাগাড়ি ভ্রমণ ছিল সংক্ষিপ্ত । তবে বড় বিরক্তিকর। ঝক্কি-ঝামেলাও কম ছিল না। সাজানাে সংসার ভাঙো, মালছামানা বাঁধে, ঠেলাগাড়িতে গাদাগাদি ওঠাও, তারপর ঠেলাঅলাদের পিছে পিছে হাঁটো। আবুল কালামও হেঁটেছে। অবশ্য নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে। ঠেলাচালকদের সঙ্গে তাে নয়ই, ঠেলার মালপত্রের সঙ্গে তার মালিকানা পথচারীরা টের পেত না। তবু লজ্জা পেত কালাম।
ঠেলায় আচ্ছাসে কষে বাঁধার পরও ফুটে বেরুত কেরানির সংসারের করুণ ছিরি। রংচটা আলমারি, ঘুণে ধরা খাটের পায়া, দাঁত দেখানাের ঢঙে তুলাে বেরুনাে বালিশ, পেসাবের দাগঅলা তােশক, একটা বাঁশের শেলফ, কিছু বই-পত্র, কলস, ঝাঁটা, শিলপাটা ইত্যাদি কত যে দামি ও তুচ্ছ টুকিটাকি। ঘরে যা ছিল গোপন, রাজপথে তা বেশরম ন্যাংটো। ভদ্রলােক পথচারীরা এমনভাবে তাকাত, যেন বাসা বদলের চলমান সাইনবাের্ড পড়ছে। আবুল কালামের নিজেকে ছােট মনে হতাে। কিরকম যেন বিপন্ন ভাব জাগত। রাস্তার দু পাশে কত বিন্ডিং, ভাড়াখেকো চার-পাঁচতলা ফ্ল্যাটবাড়ি; আর সে কিনা মুখে খড়কুটো নিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে দাঁড়কাকের মতাে উড়ছে। কিন্তু এই শহরে নীড় বাঁধার মতাে উপযুক্ত আশ্রয়ের বড় অভাব। মাসিক ২৫০ টাকা ভাড়ায় শুরু করেছিল, তা দশ বছরে ১৫০০ টাকায় উঠেছে। তার পরেও শহরে মনের মতাে একটিও বাসা পায় নি। শেষবার শাজাহানপুরে এই আস্তানায় ওঠার সময়, গড়ির সাথে দ্রুত পাল্লা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আবুল কালামের উদাস মন রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ভর করেছিল। সেই স্মৃতি স্ত্রীকে সেলিছে সে। বাসা বদলের ধাক্কায় ক্লান্ত হৃদয়কে যে কবিতাটি সেদিন-ঞ্জিত করেছিল, স্ত্রীকেও তা আবৃত্তি করে শুনিয়েছে।
ধন নয়, মান নয়, এতটুকু বাসা করেছিনু আশা.....
আবুল কালামের সেদিনের দিবাস্বপ্ন, সংসার-জীবনে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ এবং প্রধান আশাটি, অবশেষে আজ পূর্ণ হতে চলেছে। সপ্তম বারে তার শেষ বাসা বদল। ঝক্কিঝামেলা আগের থেকেও বেশি। কিন্তু আজ কালামের বিরক্তি নেই, ক্লান্তি নেই। নিজের বাড়িতে উঠে যাচ্ছে। আজ তার জীবনের একটা স্মরণীয় দিন। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর, ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ী মুক্তিযােদ্ধার বেশে অন্ত্রহাতে স্বাধীন দেশে ফিরতে যেমন লেগেছিল, আজকের খুশি খুশি ভাবটাও সেরকম কি? হবেও-বা । গত একটি বছর জমি খোজা থেকে শুরু করে বাড়ি নির্মাণ পর্যন্ত, টেনশন ও শ্রমে মাথার ঘাম পায়ে কম তাে ঝরায় নি। অবশেষে আজ গৃহপ্রবেশের শুভদিন।ট্রাক প্রস্তুত।
রাজধানী শহর তথা পৌর এলাকার সীমানা পেরিয়ে, পাকা রাস্তা ছেড়ে আধা পাকা, তারপরেও বেশ খানিকটা কাঁচা পথ পেরােলে গন্তব্যস্থান।
জায়গাটা শহরতলির অখ্যাত মামুলি এক গ্রাম। তবে নামটা সুন্দর। নিচিন্তাপুর । দূরত্বের কারণে এবং দ্রুত নিজবাড়িতে ঢুকতে পারার আনন্দেই ট্রাক ভাড়া করা। নইলে এমন নয় যে, ঠেলাগাড়ি ছেড়ে ট্রাকে উত্তরণ ঘটার মতাে সমৃদ্ধি কিংবা স্বাচ্ছন্দ্যময় গতি এসেছে সংসারে। ঠেলায় অভ্যস্ত মালপত্রগুলাে আরও পুরনাে হয়েছে বরং। তবে ট্রাকে চড়ার আনন্দে সেগুলােও যেন ডিগবাজি খাচ্ছে। তদুপরি যাচ্ছে নিজ বাড়িতে। আলমারি, টেবিল, শেলফ গর্বিত ভঙ্গিতে খাড়া, কেউ-বা শুয়ে-বসে। বৃষ্টি এলে ভিজবে। বর্ষাকাল। আকাশে মেঘ। সকালে এক প্রস্থ বৃষ্টি হওয়ায় পিচের সড়ক এখনও ভেজা। যাত্রার আয়ােজনের মাঝে আবুল কালামের মনে দুঃসাহসী অভিযানে বেরুনাের উত্তেজনাও। বর্ষাকালে বাসা বদলের ঝামেলা। তার ওপর নতুন পরিবেশে নতুন জীবন শুরু হতে যাচ্ছে। ভালােমন্দ কত কী যে ঘটতে পারে। তবে ভাড়া বাসার অভ্যস্ততা, নাগরিক জীবনের সুখ-সুবিধা বিসর্জন দেয়ায় কালামের মলভণুমাত্র দুঃখবােধ নেই। পিছুটানের তােপ্রশ্নই আসেনা আর। ) | বাড়িঅলা ও ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীদের কাছে জিদায় নিতে গিয়ে কালামের স্ত্রী নার্গিস সকলের কাছে দোয়া চায়। 6)
বাড়িঅলি হয়ে ভুলে যাবে আবার আসবেন। হ্যা, আমরাও যাব একদিন বেড়াতে।
অহেতুক ভদ্রতা কালকবিরক্ত করে। সে জানে, অর্থপিশাচ বাড়িঅলা বা পরিচিত সহভাড়াটেদের বাসায় কোনাে দিনও বেড়াতে আসবে না সে। তারাও যাবে না। সবচেয়ে নিকট প্রতিবেশী রুমার মা নার্গিসের সঙ্গে গিয়েছিল একদিন দেখতে। ফিরে এসে অন্য পড়শিদের কাছে অনেক বদনাম
‘ওই রকম জায়গায় বাড়ি বানিয়ে ছেলেপেলে নিয়ে বসবাসের বদলে চৌদ্দপুরুষ ভাড়াটে হয়ে থাকব -সেও ভালাে।
মুখে এরকম, আর তলে তলে নিজস্ব জমি-বাড়ির স্বপ্নে পাগল হবার উপক্রম। এই বয়সে টাকা রােজগারের জন্য স্বামীকে বিদেশে পাঠানাের চেষ্টা করছে। আবুল কালামের স্বপ্ন-সাধের বাড়ি অন্যান্য ভাড়াটের মনেও শুভ প্রতিক্রিয়া আনে নি। দেখা হলে যারা দেতাে হাসি দিয়ে সৌজন্য দেখায়, সালাম জানায়, আড়ালে তারাও গাল দিয়েছে।
‘বেটা করে কেরানির চাকরি। ঘুষ-দুর্নীতি না করলে এই বয়সে বাড়ি বানানাে।'.... আরে ভাই ওরকম ঘুষ খেলে ঢাকা শহরে দু-একটা বাড়ি এতদিনে আমারও হতাে।'.... করাপশনের টাকায় বাড়ি-গাড়ি যতই করুক, সুখ-শান্তি হবেনা রে ভাই, ওপরে আছে একজন।'....
অফিস ও আবাসস্থলের পড়শি জ্বলােকদের স্বার্থান্ধ ও পরশ্রীকাতর স্বভাব-চরিত্তির এত দেখা যে, এদের সংস্পর্শ থেকে কালাম তফাতে থাকতে ভালােবাসে। এই সব হিংসুটে শিক্ষিত লোকদের শহুরে পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারাটাও অচেনা এক গাঁয়ে বসবাসের সাহস যােগায়। এ ব্যাপারে স্ত্রী নার্গিসও তার সমমনা, এই অভিযানের নির্ভরযােগ্য সাথী । কিন্তু বিদায়কালে তার চোখ ছলছল কেন? রুমার মা সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “নিজের বাড়িতে যাচ্ছেন - এর চেয়ে সুখ আর কী? কি ওই জায়গায় গিয়ে বনবাসী হয়ে যাবেন না আপা। মাঝে-মধ্যে আসবেন।' | বাড়িঅলা আজ প্রকাশ্যে রুমার মায়ের সমাবেচেনা করে, 'আরে ভাই, বনজঙ্গল বলছেন কেন? আমি যখন বাড়ি বন্ত এ জায়গাতেও জঙ্গলধানখেত ছিল, রাতে শশয়াল ডাকত। বন্ধুজে বিশ্বাস করবেন? কালাম সাহেব বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন।'6) | ‘হ্যা, ঢাকা শহর যেভাবে ব্যাওসব জায়গা ডেভেলপ হতে আর কদিন লাগবে।' | চেনাজানা সবার কুহেশষ বিদায় নিয়ে কালাম স্ত্রী ও মেয়ে দুটিকে স্কুটার ভাড়া করে তুলে দেয়। নার্গিসের হাতে একটি লেদার স্যুটকেস, মেয়েদের কাঁধেও তাদের স্কুল ব্যাগ। রাস্তা খারাপ বলে ট্যাক্সি ভাড়া বেশি পড়ছে। রিকশা-বাসে গেলে অনেক টাকা বাঁচত। কিন্তু আজ আনন্দের দিনে হিসাবি স্ত্রীও বাসের বদলে স্কুটারে আপত্তি করে না। তা ছাড়া ট্রাকের আগেই তার পেীছানাে দরকার। ট্রাকের মাল-ছানা বাঁধাছদার পর কালাম নিজে উঠবসে ড্রাইভারের পাশে। কোলের ওপর টেলিভিশন।
ট্রাক গর্জন কম্পন দিয়ে চলতে শুরু করলে কালামের অন্তর থেকে সহসা গভীর আবেগ নীরবে উচ্চারিত হয় - বিসমিল্লাহ। কইর নাস্তিক না হলেও, সে ধার্মিক নয়। নামাজ-রােজা করে না। কিন্তু এই স্মরণীয় যাত্রা আল্লাহ ছাড়া আর কার নামেই-বা উৎসর্গ করতে পারে সে? সিটের সামনে চোখ বরাবর, ট্রাকের বডিতে খােদিত আল্লার বাণী চোখে পড়ে। ছােট ছােট বাংলা অক্ষরে