প্রথমদিনের আলাপ পরিচয়েই শাহ সাহেব অন্তরঙ্গ পরিবেশ গড়ে তুললেন। আমি শুধু এটুকু জেনেছিলাম যে তিনি সৈয়দ এবং আমার দুর সম্পর্কের আত্মীয়। কি করে যে তিনি আমার নিকট বা দুরসম্পৰ্কীয় আত্মীয় সে সম্পর্কে আমি কিছু জানতাম না। তিনি সৈয়দ, আমি কাশ্মিরী, ব্যস। | সে যাই থােক তাঁর সাথে আমার অসঙ্কোচ ভাব বেড়ে চলল। আদব কায়দার ব্যাপারে খুত খুত করার মেনিয়া তার নেই। তিনি যখন শুনলেন যে, আমি গল্প লিখি, তখন আমার কাছ থেকে কয়েকটি বই চেয়ে নিয়ে পড়লেন। আমি অবাক হলাম যে, কয়েকটি গল্পের তিনি খুব প্রশংসা করলেন। ঘটনাক্রমে সে গল্পগুলো সাহিত্য জগতে উল্লেখযােগ্য সৃষ্টি বলে সমাদৃত হয়েছিল।
| শাহ সাহেব ছিলেন আমার প্রতিবেশী। একটা ঘর তিনি এলট করে রেখেছিলেন। কিন্তু পরিবারের লােকসংখ্যা বেশী হওয়ায় ফ্ল্যাটের নীচের মােটর গ্যারেজও তিনি অধিকার করেছিলেন। উপরে মেয়েরা থাকতেন। শাহ সাহেবের বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা ছিল অনেক, গ্যারেজের বৈঠকখানায় তিনি তাদের আপ্যায়ন করতেন।
একদিন গল্প সম্পর্কে তার সঙ্গে আলাপ হলে তিনি বললেন, আমার জীবনে এমনকিছু বাস্তব ঘটনা রয়েছে যেগুলােকে আপনি গল্পাকারে রূপ দিতে পারেন। আমি সব সময় গল্পের মাল-মশলা খুজে বেড়াই, এজন্য শাহ সাহেবের কথায়, মনােযােগী হলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে বললাম-আপনি ভাল মাল-মশলা দেবেন বলেই আমি আশা করি।'
শাহ সাহেব জবাবে বললেন, ‘আমি গল্পকার নই, কিন্তু আমার জীবনে এমন ঘটনা রয়েছে যা কিনা উল্লেখযােগ্য। উল্লেখযােগ্য বললাম এজন্য, কারণ আপনি একজন উচুদরের গল্প লেখক। তা না হলে আমি যে ঘটনা বর্ণনা করব এ ঘটনাকে বলা যায় অত্যন্ত বিস্ময়কর।
শাহ সাহেব বললেন, আমি তা কি আর বলব, তবে যে ঘটনা শােনাতে যাচ্ছি সে ঘটনা প্রত্যেকেরই বিস্ময়ের উদ্রেক করবে। আমি শুধু নিজের প্রতিক্রিয়াই আপাকে জানাবাে, তবে এটা ঠিক যে ঘটনা আপনাকে শােনাবাে, এটা এ যাবত সংঘটিত আমার জীবনের ঘটনাপুঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর।
‘নেইল কাটার দিয়ে শাহ সাহেব নখ কাটতে শুরু করলেন। আমি তার কাহিনী শােনার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু সম্ভবত কাহিনী কিভাবে এবং কোথা থেকে শুরু করবেন সেটাই ভাবছিলেন। আমার এ ধারণা মিথ্যা ছিল না। বহু বছর আগের ঘটনা হেতু শাহ সাহেব ঘটনার সূচনা-পর্ব নিজের মনে সাজিয়ে-গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। | আমি সিগারেট ধরালাম। শাহ সাহেব দশ আঙ্গুলের নখ কেটে টেবিলের ওপর রেখে আমাকে সম্বােধন করে বললেন, আমি কাবুলে ছিলাম।' এই বলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘সেখানে আমার বেশ বড় একটা দোকান ছিল, সে দোকানে মূল্যবান সব জিনিসপত্র মওজুদ রাখতাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি জেনারেল মার্চেন্ট ?”
শাহ সাহেব জবাব দিলেন, ‘জী, হ, কাবুলের সবচেয়ে বড় জেনারেল মার্চেন্ট। আমার দোকানে কাবুলের প্রায় সব মেয়েরা সওদা করতে আসতাে। আপনাকে একটা কথা বলছি। পাশের দোকানী যদি আমার দোকানে কোনদিন শুধু পুরুষ ক্রেতা দেখতে তাহলে ফার্সী ভাষায় দুঃখ প্রকাশ করে বলতে --আগা, আজ একি হলাে, কাবুলের মহিলারা আর মেয়েরা কি মরে গেছে ? নাকি তােমার নসিব ঘুমিয়ে পড়েছে? | শাহ সাহেব হেসে ফেললেন। এ ছাড়া তিনি কি আর জবাব দিতে পারতেন। তবে তার দোকানে অধিকাংশ যে মহিলা এবং তন্বী তরুণী ক্রেতা আসতো, এ সম্পর্কে তিনি নিজেও অবহিত ছিলেন। তার বাকচাতুরীই যে এর মূল কারণ এটাও তার অজানা ছিল না।
| তিনি আমাকে বললেন, ‘মান্টো সাহেব, আমি একজন উৎকৃষ্ট সেলসম্যান, বিশেষত মেয়েদের সাথে কেনাকাটা করার ব্যাপারে আমি এমন চমৎকার নৈপুণ্যের পরিচয় দিতে জানি যে, এখানে লাহােরে আমার জুড়ি খুজে পাওয়া যাবে না। বি. এ. পাশ করেছি। অল্প স্বল্প সাইকোলজিও পড়েছি, এ জন্য মেয়েদের কি ভাবে পটাতে হয় কি ভাবে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় সে সব আমার ভালই জানা আছে। এ কারণেই সমগ্র কাবুলে শুধু আমার দোকানেই এমন কোন সময় যেতো না যখন কোন ক্রেতাই থাকতাে না।
শাহ সাহেবের এ আত্মপ্রশংসা শুনে আমি বললাম, “নিঃসন্দেহে আপনি উৎকৃষ্ট সেলস্ম্যান। আপনার কথা বলার স্টাইলও তার প্রমাণ দিচ্ছে।'
শাহ সাহেব হেসে বললেন, কিন্তু দুঃখ হলো। আমি উৎকৃষ্ট সেলস্ম্যান হিসেবে নিজের কাহিনী বর্ণনা করতে সক্ষম হবে না।
আমি বললাম, আপনি শুরু করুন। শাহ সাহেব আবার কিছুক্ষণের জন্য স্মৃতির রাজ্যে হারিয়ে গিয়ে কাহিনী শােনাতে শুরু করলেন। বললেন, 'আপনাকে আগেই বলেছি যে, আমি কাবুলে ছিলাম। এটা এখন থেকে প্রায় দশ বছর আগের কথা। আমার স্বাস্থ্য ছিল তখন অত্যন্ত ভালাে। এমনিতে আমাকে এখনাে সুদেহী পুরুষ বলা হয় কিন্তু যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় আমার স্বাস্থ্য ছিল বর্তমানের দ্বিগুণ। প্রতিদিন খেলাধুলা করতাম, নানা রকমের ব্যায়াম করতাম, সিগারেট মদ ছুতাম না, তবে ভাল ভাল খাবার খাওয়ার অভ্যাস ছিলো। আমি আফগান নই, ভারতীয়। এজন্য ভারতের অমৃতসর থেকে একজন নামকরা কাশ্মিরী বাবুর্চি নিয়ে গিয়েছিলাম। সেই বাবুর্চি প্রতিদিন আমার জন্য সুস্বাদু খাবার তৈরী করে টেবিলে সাজিয়ে রাখতে। বড় সুখে স্বচ্ছন্দে জীবনের দিনগুলাে কাটছিল। ব্যাঙ্কে লাখ লাখ আফগানী মুদ্রা সঞ্চিত হচ্ছিল, কিন্তু '
শাহ সাহেব কিছুক্ষণের জন্য আবার নীরব হয়ে গেলেন। আমি তাকে বললাম, কিন্তু বলে আপনি নীরব হয়ে গেলেন, এর কি এই অর্থ দাঁড়ায় যে, এতদসত্ত্বেও আপনি ছিলেন অসুখী ?’ |
শাহ সাহেব স্বীকার করলেন। বললেন, ‘জী, হাঁ, এতে স্বাচ্ছন্দ্য সত্বেও আমি অসুখী ছিলাম। কারণ আমি ছিলাম তখন একাকী, অবিবাহিত।
যদি আমার দোকানে মহিলা এবং যুবতী মেয়েরা না আসতো তবে সম্ভবত আমার একাকীত্বের অনুভূতি প্রকাশ পেতাে না। কিন্তু বাস্তব অবস্থা ছিল এর বিপরীত। কাবুলের সব বিত্তবান মেয়েরা আমার দোকানে আসততা। দোকানে প্রবেশ করেই এসব মেয়েরা নিজ নিজ বােরখা খুলে এক পাশে রেখে দিত এবং কেনাকাটায় মনােনিবেশ করতে। মান্টো সাহেব, আপনি হয়তো ভাবতে পারেন যে, তারা শরীয়তের বিধি সম্মত পােশাক পরিধান করতে কিন্তু আসলে তা নয়। কিন্তু এখানের মেয়েরা পর্দা করলেও ইউরােপীয় কায়দায় পােশাক পরিধান করে। ছােট করে চুল ছাটা, রঙ্গিন নখ, পায়ের অনেকটা নগ্ন। দোকানে এসে বােরখা খুলে রেখে তারা জিনিসপত্র পছন্দ করতাে।
শাহ সাহেব আবার চুপ করে রইলেন। আমি বললাম, আপনি নিশ্চই তাদের কাউকে ভালবেসে ফেলেছেন।
শাহ সাহেব সায় দিয়ে ব্যর্থ কণ্ঠে বললেন, ‘জী, হ, একটা মেয়েকে আমি ভালােবেসে ফেলেছিলাম, মেয়েটি দোকানে প্রবেশ করেও বােরখা খুলতাে না, এমন কি চেহারার নেকাবও তুলতাে না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কে ছিল সে?
তিনি বললেন, 'সে ছিল এক অভিজাত পরিবারের মেয়ে। তার পিতা ছিলেন সেনাবাহিনীর পদস্থ অফিসার। মেয়েটি হাতের কজি ছাড়া দেহের অন্য কোন অংশ প্রদর্শন করতাে না, এই দঢ়তাব্যঞ্জক বৈশিষ্টের কারণেই আমি তাকে ভালবেসে ফেলেছিলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, এর কারণ ?
শাহ সাহেব বললেন, 'আমি জানি না। এ ব্যাপারে তাকে কখনো জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু আমার ধারণায় সে ছিল অনিন্দ-সুন্দরী। গৌরবর্ণা। সারাদেহ বোরখায় আবৃত থাকলেও দেহের গঠন বিন্যাস সম্পর্কে ধারণা করা কষ্টকর ছিল না। আমি চোরা-চোখে দেখেছিলাম, সে ছিল যৌবনের আদর্শ সময়। কিন্তু মুশকিল হলো, সে কয়েক মিনিটের জন্য আমার দোকানে আসতে, জিনিসপত্র পছন্দ এবং দাম দস্তুর করতে কয়েক মিনিট সময় ব্যয় করে চলে যেতে।