পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে আমি তখন সবেমাত্র ঢাকা ইডেন কলেজে ভর্তি হয়েছি। হস্টেলে থাকি। হঠাৎ একদিন সকালে শুনলাম জেঠামশাই বাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছেন। পরদিন ক্লাশে অনেক পড়া, কাজেই মনে মনে একটু বিরক্তই হলাম।।
আগের দিন বৃষ্টি হওয়াতে রাস্তায় কাদা জমেছে। আমি সেই কাদার ভিতর দিয়েই হেঁটে চলেছি। ফলে আমার শাড়ীর পাড় আর জুতাের রং দুয়েরই চেহারা একেবারে অন্য রকম। সেই অবস্থায় বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম।
মাথায় লম্বা বেণী, কোমরে আঁচল শক্ত করে জড়ান। পায়ে আর শাড়ীর পাড়ে কাদা। আমার দিদি তাে (বেথুন কলেজে বি. এ. পড়ে। কয়েক দিনের জন্য ঢাকায় এসেছে) আমাকে দেখে হেসেই অস্থির। আমি চটে গিয়ে বললাম, “হাসি থামিয়ে এখন দয়া করে কিছু খেতে দিয়ে বাধিত কর।
এমন সময় জেঠামশাই দোতলা থেকে হাঁক দিয়ে বললেন, ‘মা লাবণ, কয়েকখানা লুচি নিয়ে এস তাে!
| দিদি লুচির পাত্রটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়েই হাসি চাপতে দূরে সরে গেল। আমিও সেটা নিয়ে দুমদাম শব্দ করতে করতে উপরে চলে গেলাম। | জেঠামশাইকে ঝাঁঝের সঙ্গে কি একটা বলতে যাব, তাকিয়ে দেখি সেখানে একজন ভদ্রলােক বসে আছেন। তিনি আমার দিকে একবার তাকিয়েই তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নিলেন।
জেঠামশাই আমাকে বললেন, এই যে মা, এস আলাপ করিয়ে দি। এঁর নাম জীবনানন্দ দাশগুপ্ত। দিল্লী থেকে এসেছেন।
আমার তখন রাগের বদলে হাসির পালা। ছােটবেলা থেকে বেশ ভালভাবেই হাসিটি আয়ত্ত করেছিলাম। হাসি সামলাতে না পেরে ভদ্রলােকের দিকে পিছন ফিরেই একটা টুলের উপরে বসে পড়লাম।
জেঠামশাই বারবারই বলতে লাগলেন, ‘ওকি, পিছন ফিরে বসেছ কেন? ঠিক হয়ে বস। বাড়িতে অতিথি এলে ঠিকভাবে আপ্যায়ন না করাটা খুব অন্যায়। ইনি তােমাকে কি ভাবছেন?
ইনি নামক ব্যক্তিটি আমাকে যাই-ই ভাবুন না কেন, ঠিক হয়ে বসব কি-আমি তখন আমার হাসি সামলাতেই ব্যস্ত। যাই হােক, কিছুক্ষণ চেষ্টার পর আমি তার দিকে ফিরে বসলাম। কিন্তু অসীম ধৈর্য ভদ্রলােকটির যতক্ষণ পর্যন্ত আমি না ফিরলাম, তিনি চুপ করেই বসে রইলেন।
তাঁর দিকে ফেরার পরে তিনি আমাকে তিনটি প্রশ্ন করলেন। ‘আপনার নাম কি? আই এ-তে কি কি সাবজেক্ট নিয়েছেন এবং কোনটি আপনার বেশী পছন্দ।
কোনও মতে প্রশ্ন তিনটির উত্তর দিয়ে ভদ্রলােককে কিছু না বলেই উঠে নীচে দৌড় দিলাম। রান্নাঘরে ঢুকেই দিদিকে গুম গুম শব্দে কিল মারতে আরম্ভ করলাম। দিদি আমার হাত দুখানা শক্ত করে ধরে রেখে বলল, ‘তাের হ’ল কি?
আমি আরও রেগে গেলাম। আমার কেন হ’তে যাবে? হয়েছে। তােমাদের। আজ তােমরা আরম্ভ করেছ কি? ঐ ভদ্রলােকটি কে, আর আমাকে সাত সকালে ডেকে পাঠাবারই বা কারণ কি? দিদি তখন আমি কি জানি? ভদ্রলােকটির খবর তাে তােরই রাখবার কথা। বলেই অন্য ঘরে ঢুকে গেল।
কিছুক্ষণ পরে জেঠামশাই সেই ভদ্রলােকটিকে নিয়ে নিচে নেমে বাইরের দিকে চলে গেলেন। আমি তাঁদের দেখেই মুখ ফিরিয়ে বসে রইলাম।
দুপুরবেলা জেঠামশাই আমাকে তার ঘরে ডেকে নিয়ে এ-কথা সেকথার পর হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, লাবণ্য মা, সকালের ভদ্রলােকটিকে তােমার কেমন লাগল?' আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, উনি এসেছিলেন কেন? উত্তরে জেঠামশাই বললেন, তাহলে বলি শোেন। উনি দিল্লীর রামযশ কলেজের একজন অধ্যাপক। তােমাকে দেখতে এসেছিলেন। আমি তখন পরিস্কার, জানিয়ে দিলাম যে বি-এ পাশ না করে বিয়ের কথা ভাববই না।
ছেলেবেলায় মাত্র তিন মাসের তফাতে বাবা, মা দুজনকেই হারিয়েছিলাম বলে আমাদের অকৃতদার জেঠামশাই (অমৃতলাল গুপ্ত) তাঁর সবটুকু স্নেহ ঢেলে দুজনের জায়গাই পূর্ণ করতে চেষ্টা করতেন। তিনি আমাকে অনেক বােঝালেন, “তুমি যে বিয়ে করতে চাইছ না, আমি চোখ বুজলে তােমাকে কে দেখবে? তােমার দিদির বিয়ের কথা চলছে। হয়ত শিগগিরই, ঠিক হয়ে যাবে। তােমার ছােট বােনটি খুবই ছােট। তার বিয়ের কোন প্রশ্নই ওঠে না। সুতরাং তােমার জন্যই আমার এখন চিন্তা। তাছাড়া-উনি তাে তােমাকে পড়াতে রাজী আছেন। তাহলে তােমার বিয়েতে আপত্তি করার কি আছে?
সত্যিই তাে, বাবা-মা নেই। দিদির বিয়েও ঠিক হচ্ছে। এখন আমার বিয়ে হয়ে গেলেই জেঠামশাই দায়মুক্ত হবেন। অতএব মত আমাকে দিতেই হবে। তবুও শেষবারের মত বললাম, ভদ্রলােকের মত না জেনেই-আমাকে এ কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?' তখন জেঠামশাই হাসতে হাসতে বললেন, তিনি সকালে তােমাকে দেখেই মত দিয়েছেন।'
আমার তখন অবাক হবার পালা। ছােটবেলা থেকে শুনে আসছি-কত রকম ভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে তবে মেয়েকে বরপক্ষীয় লােকের সামনে দাঁড় করাতে হয়; তাঁরা হাজার রকম প্রশ্ন করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা করে তবেই মতামত দেন। মেয়েদের সে এক ভীতিজনক অবস্থা। কিন্তু আমার বেলা!
সে যাই হােক, ২৬ শে বৈশাখ (৯ই মে) শুক্রবার (শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে) বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেল। কবির কবিত্ব শক্তির কোন রকম পরিচয় তখনও আমরা পাইনি। আমাদের কাছে তিনি অধ্যাপক হিসেবেই পরিচিত হলেন।
বিয়ে ঠিক হবার পরে কেন জানি না মা-বাবার কথা খুব বেশী করে মনে হতে লাগল। কিন্তু তাদের স্মৃতি আর আমার মনে কতটুকু? বড় হয়ে আমার দিদিমার মুখে শুনেই যেটুকু ধারণা।
আমার বাবা, রােহিণীকুমার গুপ্ত ছিলেন খুলনার বৈদ্যপ্রধান অঞ্চল সেনহাটির কুলীন বৈদ্য সন্তান। আর আমার মা যশােহর জেলার ইতিনা গ্রামের তারাপ্রসন্ন সেনের একমাত্র মেয়ে সরযু গুপ্ত (সেন)।।
সেন রাজাদের আমলে মহারাজ লক্ষ্মণ সেন যে আটজনকে কুলীন বলে চিহ্নিত করেন, তাঁদের মধ্যে বৈদ্য বংশের কাশ্যপ গােত্রীয় কায় একজন। তার উপাধি ছিল গুপ্ত। কায়ু গুপ্তের ছেলে বনমালী সেনহাটিতে এসে বাস করতে আরম্ভ করেন। সেনহাটি সর্বপ্রধান কুলস্থান বলেই প্রসিদ্ধ, আমার বাবা রােহিণীকুমার গুপ্ত এই বংশেরই সন্তান। বাবার ঠাকুমায়ের এক পূর্বপুরুষ ছিলেন চন্দ্রদ্বীপের শেষ রাজার দেওয়ান । রাজার কাছ থেকে তিনি প্রচুর ভূ-সম্পত্তি পেয়েছিলেন। বাবার মুখে শুনেছি, বাখরগঞ্জ জেলার সুবিখ্যাত ‘দুর্গা সরােবর’ নামে প্রকাণ্ড দীঘিটি তিনিই তৈরি করিয়েছিলেন। এই সরােবরের কথা আজও সেখানকার প্রতিটি গ্রামের লােকের মুখে শুনতে পাওয়া যায়।
ভগবান আমার বাবা-মা দু’জনকে অকৃপণ হাতে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। আমার মা ছিলেন নিষ্ঠাবান হিন্দু পরিবারের মেয়ে। গল্প শুনেছি-তিনি মুরগীর মাংস খাওয়া তাে দূরের কথা, বাড়িতে আনতেও দিতেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিশালিনী এবং তার স্বভাবটি ছিল কঠোর ও কোমলের অপূর্ব সমন্বয়।
আমার বাবা যেমনি ছিলেন স্ফুর্তিবাজ, তেমনি ছিল তার দরাজ মন। হিন্দু সন্তান, কোন রকম কুসংস্কারের ধার দিয়েও তিনি যেতেন না।
আমার বয়েস যখন সাত বছর কয়েক মাস, সেই সময় বাবা শ্রাবণে ও মা অগ্রহায়ণে বলতে গেলে একই সময়ে দু’জনে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন। এর পরে পরে আমরা তিনটি বােন ও একটি ভাই আমাদের বড় | জেঠামশাই-এর কাছে চলে আসি।
| আমি গিরিডিতে উচ্চ ইংরেজী বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সেখানকার বাের্ডিং-এ থেকে পড়াশুনা আরম্ভ করলাম। আমার দিদি প্রমীলা গুপ্ত (কমিশনার বি দে-র মেজো ছেলে ও সরােজনলিনী দত্তের ভাই-বি এন রেলওয়ের প্রাক্তন কমার্শিয়াল ট্রাফিক ম্যানেজার বসন্তকুমার দে-র স্ত্রী। তিনি কয়েক বছর হল পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন) ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আমাদের একমাত্র ভাই শান্তিবিন্দু গুপ্ত (মাদ্রাজে একটি বৃটিশ ফার্মের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার) ও ছােট বােন নন্দিনী গুপ্তকে (দুর্গাপুরে বার্ন কোম্পানীর ওয়েলফেয়ার অফিসার নিশীথ ঘােষের স্ত্রী) গয়ায় মেজো জেঠামশাই বিহারীলাল গুপ্তের কাছে রাখা হল।
এইভাবেই শুরু হ’ল পিতৃমাতৃহীন আমাদের চারটি ভাই-বােনের জীবনযাত্রা । ভগবানই হয়ত হাল ধরেছিলেন-তাই তীরের দেখা পেলাম।
এবারে কবির পিতৃ ও মাতৃকুলের পরিচয় দিতে হলে আমাকে অতীতে ফিরে যেতে হয়।।
| কবির ঠাকুরদাদা সর্বানন্দ দাশের আদিনিবাস ছিল বিক্রমপুরের গাউপাড়া গ্রামে। গ্রামটি সর্বনাশী পদ্মার করাল গ্রাসে পড়ায় তিনি বরিশালের শান্ত সুন্দর পরিবেশে এসে ঘর বাধলেন ।
তার ছিল সাত ছেলে ও চার মেয়ে। ছেলেরা হলেন-হরিচরণ, সত্যানন্দ, যােগানন্দ, অতুলানন্দ, প্রেমানন্দ, ব্রহ্মানন্দ ও জ্ঞানানন্দ। মেয়েদের মধ্যে একজন বাইশ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। পাঞ্জাবনিবাসী ব্রজেন্দ্রনাথ সেনের সঙ্গে বড় (তাদের এক ছেলে হলেন এইচ.এম.ভি-এর প্রাক্তন রেকর্ড অধিকর্তা পি কে সেন) এবং কোটালীপাড়ার সুগায়ক মনমােহন চক্রবর্তীর সঙ্গে মেজো মেয়ের বিয়ে হয়। সকলের ছােট স্নেহলতা দাশ বরিশাল সদর বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি আজীবন কুমারী থেকে দেশের ও দশের সেবায় আত্মােৎসর্গ করেন।
সর্বানন্দের মেজো ছেলে সত্যানন্দই কবির বাবা। সৌম্যমূর্তি সত্যানন্দ একজন শিক্ষাব্রতী ছিলেন। তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল অপারঅসীম।
খ্যাতনামা মহিলা কবি কুসুমকুমারী দাশ হলেন জীবনানন্দের মা (গৈলার চন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের বড় মেয়ে)।
বসন্তকালে ঋতুরাজের পায়ের ধ্বনি শােনার সঙ্গে সঙ্গেই মলয়পবন সবুজ বনানীর শ্যামলিমাকে দিকে দিকে ছড়িয়ে দেয়। গাছের বুকে দেখা দেয় নতুন পাতা। নীলাকাশ থেকে ভেসে আসে পাখির আনন্দ লহরী। ফাল্পন মাসের এইরকম একটি দিনেই বরিশালে জন্ম নিলেন কবি জীবনানন্দ। | বাবার ধ্যানগম্ভীর ভাব ও মায়ের অপার সহনশীলতা এই দুয়ের মিশ্রণে গঠিত হ’ল তাঁর চরিত্র। আমাদের দেশের প্রতিটি সন্তান কম কথা বলে কাজের ভিতর দিয়েই তার মনুষ্যত্বকে ফুটিয়ে তুলুক-এই ছিল মায়ের ঐকান্তিক মনােবাসনা। তাঁর এই মনােভাব মূর্ত হয়ে উঠেছে তাঁর বিখ্যাত কবিতায়।
‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।
কম কথা বলে, কাজে বড় হয়ে পৃথিবীতে তাঁর মায়ের কবিতাকে স্বীকৃতি দিয়ে গেলেন কবি জীবনানন্দ। | কবির বাল্য ও কৈশাের কেটেছে বরিশালের ব্রজমােহন বিদ্যালয়ে। জগদীশ মুখােপাধ্যায় ছিলেন ঐ প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক। বালকের শিক্ষানুরাগ সেই জ্ঞানী পুরুষকে মুগ্ধ করেছিল। তাই শিক্ষাব্যাপারে জীবনানন্দকে সব রকম সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কবি জীবনের উন্নতির অনেকগুলি সােপানই অনায়াসে পার হয়ে যেতে পেরেছিলেন।
| প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করার পর তিনি এসে ভর্তি হলেন ব্রজমােহন কলেজে। স্বনামধন্য দেশভক্ত অশ্বিনীকুমারের বাবার নামেই কলেজটি স্থাপন করা হয়েছে। এই কলেজ থেকে ফার্স্ট ডিভিশনে আই এ পাশ করে তিনি কলকাতায় এলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে বি এ পড়তে।
১৯২১ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে হাই সেকেন্ড ক্লাস পেয়ে এম-এ পাশ করেন। কবির মুখে শুনেছি-পরীক্ষার কিছুদিন আগে তিনি দারুণ ব্যাসিলারী ডিসেন্ট্রি রােগে শয্যাশায়ী ছিলেন। ঐ বছর পরীক্ষা দিতে পারবেন না বলে তার মাকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু নানা অসুবিধে থাকাতে মায়ের অনুমতি পেলেন না। বাধ্য হলেন পরীক্ষা দিতেকিন্তু প্রথম শ্রেণীর সম্মান আর পেলেন না তিনি। | এম-এ পাশ করার পরে তিনি সিটি কলেজে অধ্যাপনার কাজ নিয়ে তার কর্মজীবন আরম্ভ করেন। ১৯৩০ সনে যখন তিনি দিল্লীর রামযশ কলেজে ছিলেন, সেই সময়েই আমার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের ব্যাপারে তাঁর যে চারিত্রবৈশিষ্ট্য ছিল, তার কিছুটা পরিচয় এখানে দিচ্ছি।
আমাকে বিয়ে করার আগে এক ধনী ভদ্রলােকের মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ের প্রস্তাব আসে। তিনি নিজেই মেয়ে দেখতে গেলেন-সঙ্গে ছিলেন তাঁর মেলােমশাই (বরিশাল বাণীপীঠ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক) রসরঞ্জন সেন।
| পাত্রীপক্ষের আদর আপ্যায়নের ক্রটি ছিল না। মেসােমশাই ত’ তাদের ব্যবহারে মুগ্ধ। কবি কিন্তু সব সময় চুপ করেই রইলেন। এমন কি সালঙ্কারা মেয়েটিকে দেখে ও তাঁকে বিলেতে পাঠাবার প্রস্তাব শুনেও কোন কথাই বললেন না। বাড়ি ফেরার পরে মেয়েটিকে পছন্দ হয়েছে কি না সে কথা বারবার জিগ্যেস করেও কবির কাছ থেকে কোন উত্তরই পাওয়া গেল ।
পরদিন দুপুরে আর একবার যাবার অনুরােধ জানিয়ে পাত্রীপক্ষ গাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। কবি তখনও যেন চিন্তা করছেন। মেসােমশাই তাঁকে যাবার জন্য তৈরি হতে বললেন। কিন্তু তিনি বললেন, তুমি যাও। আমি যাব না।' | ‘সে কি কথা? বিয়ে করবি তুই, আর যাব আমি?' মেলােমশাই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
কবি কিন্তু ধীরভাবেই উত্তর দিলেন, যেখানে বিয়ে করব না বলেই ঠিক করেছি, সেখানে দ্বিতীয়বার যাওয়াটাও আমি অনুচিত বলেই মনে করি।'
সেদিন মেসােমশাই-এর শত অনুরােধও তাঁকে তাঁর সংকল্প থেকে টলাতে পারেনি।
আবার এ ব্যাপারে তিনি যে কতটা উদার ছিলেন, তার পরিচয় পেয়েছি আমার বিয়ের সময়। বিয়েতে একটিমাত্র আংটি ছাড়া-বােতাম, ঘড়ি অথবা আসবাব কিছুই তাঁকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু সেই আংটিটির জন্যই তিনি কত লজ্জিত কত কুণ্ঠিত। যেন মহা অপরাধে অপরাধী। বিয়ের পরে বরিশালে গিয়ে তার বড় পিসীমাকে বলেছিলেন, “তােমরা যদি বলে দিতে, তাহলে আমি নিজেই একটা আংটি কিনে নিয়ে যেতাম। আমার জন্য লাবণ্যর জেঠামশাইকে শুধু শুধু কতগুলাে টাকা খরচ করতে হল। তাছাড়া বিয়ে করতে গেলে কিছু না কিছু পেতেই হবে- এ নিয়মই বা আছে কেন?
কবির কথা শুনে বড়পিসীমা হাসিমুখে উত্তর দিলেন, সমাজের দোহাই দিচ্ছিস কেন? তােরা না নিলেই পারিস। কিন্তু আমি তাে দেখি বিয়ের সময় বেশির ভাগ ছেলে বাপ-মায়ের অতি-বাধ্য হয়ে বাবা মায়ের কথার উপরে আমি কি কিছু বলতে পারি- এই কথাই বলে বসে।'
কবি তার এই তেজস্বিনী পিসীমাকে ভাল করেই চিনতেন। তাই আর কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে সরে পড়াই শ্রেয় মনে করলেন।
| ফুলশয্যার রাতে তাঁর সর্বপ্রথম কথা হল- ‘আমি শুনেছি তুমি গাইতে পার। একটা গান শােনাবে?
আমি আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করলাম, কোনটা?
‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে, গানটা যদি জান তবে সেটাই শােনাও।
আমার এখনও মনে পড়ে, প্রথমবার গাইবার পরে তিনি আরও একবার গাইতে বললেন।
অনেকদিন পরে আমি একদিন হাসতে হাসতেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আচ্ছা, তুমি প্রথম দিনেই ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়াতে চেয়েছিলে কেন?'
তিনিও হেসেই উত্তর দিলেন, 'এই লাইন দুটোর অর্থ বল ত? “আজি এ কোন গান নিখিল প্লাবিয়া তােমার বীণা হতে আসিল নামিয়া।”
আমি চুপ করেই দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি তখন আস্তে আস্তে বললেন, ‘জীবনের শুভ আরম্ভেই তাে এ গান গাওয়া উচিত এবং শােনাও উচিত।'
কবিতার খাতা ছিল কবির প্রাণ। সে-সব খাতা তিনি কাউকে ছুঁতেও দিতেন না। এমন কি তাঁর টেবিলের সামনে গেলেও তটস্থ হয়ে উঠতেন। কিন্তু প্রয়ােজন বােধে-আমার জন্য সেসব খাতার চরম দুর্গতিও তাঁকে হাসিমুখে সহ্য করতে দেখেছি।
আমার বিয়ের কিছুদিন পরের কথা। যে যুগে স্বাধীনতা-সংগ্রামের বীজ দিকে-দিকে, দেশে-দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, নিজেকে সেই যজ্ঞে আহুতি দেবার জন্য বিনয়, বাদল, দিনেশ, প্রীতি হাসিমুখে এগিয়ে এসেছিলেন- আমি সেই যুগেরই মেয়ে। কাজেই ইংরেজের কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হইনি।
একদিন সকালে হঠাৎ আমার নামে ওয়ারেন্ট ও বেশ কয়েকজন পুলিশ নিয়ে আই বি ডিপার্টমেন্টের তিনজন অফিসার আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। কবি তখন সামনের দিকের ঘরেই ছিলেন। একজন অফিসার তাকে জিগ্যেস করলেন, ‘লাবণ্য দাশগুপ্ত কার নাম?
কবি উত্তর দিলেন, আমার স্ত্রীর নাম?
অফিসারটি সঙ্গে সঙ্গেই বললেন, তাঁর নামে ওয়ারেন্ট আছে। আপনি কয়েকজন দ্রলােক ডাকুন। আমরা ঘর সার্চ করব।'
কবি নিঃশব্দে তাঁর ঘর দেখিয়ে দিলেন। দুটি ঘণ্টা ধরে পুলিশের তাণ্ডব নৃত্যের ফলে তার অতিপ্রিয় কবিতার খাতাগুলির যা অবস্থা হয়েছিল তা দেখে আমার মত কাব্যরস-বঞ্চিত মানুষের চোখেও জল এসে গিয়েছিল । | শুধু সার্চ করেই অফিসাররা থামলেন না। জেরার জন্য আমাকেও তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হ’ল। তারা একটা নাম জানবার জন্য অনেক চেষ্টা করে শেষে হাল ছেড়ে দিলেন।