গুজরাতী প্রথা অনুসারে পুত্রের নামের সঙ্গে পিতার নাম যুক্ত করে পরিশেষে যােগ করতে হয় বংশের পদবী। যেমন গান্ধী বংশের করমচাদের পুত্র মােহনদাস। যেমন তাতা বংশের নাসরবানজীর পুত্র জামশেটজী। তেমনি খােজানী বংশের ঝীণাভাইয়ের পুত্র মহম্মদালী। বড়াে হয়ে মহম্মদালী তার নামটাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন। মহম্মদ আলী। তার পিতার নামকেও দুই ভাগে বিভক্ত করে প্রথম ভাগটাকেই করেন তার পদবী। দ্বিতীয় ভাগটা বর্জন করেন। বাদ যায় বংশ পদবীও। বিলিতী কায়দায় বানান করতে গিয়ে ঝীণা হয়ে যায় এমন একটি শব্দ যার উচ্চারণ সাহেবদের মুখে জিনা, ভারতীয়দের মুখে জিন্না, আরবদের মুখে জিন্নাহ্। যেমন আল্লাহ। ইংরেজদের বানানে মহারাজা শব্দটির অন্তেও এইচ জুড়ে দেওয়া হতাে। বার্মার অন্তেও। হাওডার অন্তে এখনাে হয়।
জিন্না সাহেব যে সম্প্রদায়ের মুসলমান তার নাম ইসমাইলিয়া খোজা। একবার 47 0166.13 6 0167697311591, “The term 'Hindu' includes Ismailia Khoja.” আইনটা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত। তাই যদি হয় তবে জিন্না সাহেব উত্তরাধিকারসূত্রে হিন্দু। কিন্তু ধর্মবিশ্বাসে মুসলমান। ধর্ম যত সহজে বদলানাে যায় উত্তরাধিকার তত সহজে নয়।
গুজরাতী হিন্দুদের অনেকের নাম ঝীণা। তার মানে ‘ছােট। কে জানে ‘ছােট থেকে বড়াে হওয়ার আকাঙ্ক্ষা মহম্মদ আলীর অন্তরে কাজ করছিল কি না। নিজের প্রতিভার জোরে তিনি বড়াে ব্যারিস্টার হয়েছিলেন। বড়াে রাজনীতিক হওয়াও স্বাভাবিক। হলেন শেষ পর্যন্ত একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা গভর্নর জেনারেল। বেঁচে থাকলে প্রেসিডেন্টও হতে পারতেন। তার মতে পাকিস্তানই নাকি বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। কিন্তু তার চেয়ে বড়াে কথা—এটা তার একার সৃষ্টি। গান্ধী না থাকলেও ভারত একদিন না একদিন স্বাধীন হতাে। কিন্তু জিন্না
থাকলে পাকিস্তান কি আদৌ সম্ভব হতাে ? ভারতকে স্বাধীন করার দাবীদার আরাে একজন কি দু’জনের নাম শােনা যায়, কিন্তু পাকিস্তানকে স্বতন্ত্র করার দাবীদার আর একজনও নেই। লা শরিক জিন্নাহ্। যেমন লা শরিক আল্লাহ্।
এমন এক ইতিহাস-নির্মাতার ইতিকথা লিখেছেন শ্রী শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি স্বয়ং একজন গান্ধীপন্থী। গান্ধীপন্থীর পক্ষে জিন্না সাহেবকে বােঝও সহজ নয়, বােঝানােও সহজ নয়। তবে গান্ধীপন্থীদের আদর্শ হলাে খ্ৰীষ্টপন্থীদের মতাে শত্রুকেও ভালােবাসা, অপরাধী হয়ে থাকলে ক্ষমা করা, বিদ্বেষ পুষে না রাখা, মন্দের ভিতর থেকে ভালাে আসে এই তত্ত্বে বিশ্বাস বজায় রাখা। চল্লিশ বছর পরে জিন্না সম্বন্ধে সহৃদয়ভাবে বিচার করার সময় এসেছে। সে ভার নিয়েছেন গ্রন্থকার।
ঐতিহাসিক পুরুষরা ইতিহাসের হাতের যন্ত্র হিসাবেই কাজ করে যান। কখনাে জ্ঞাতসারে, কখনাে অজ্ঞাতসারে। তারা যে কোথা থেকে শুরু করে কোথায় গিয়ে শেষ করবেন তা তারও আগে থেকে জানেন না। দাবাখেলায় একপক্ষের চাল নির্ভর করে অপরপক্ষের চালের উপরে। ব্রিটিশ শাসকরা একটা চাল দিলে গান্ধীজী দিতেন তার পাল্টা চাল। আর গান্ধীজী একটা চাল দিলে জিন্না সাহেব দিতেন তার পাল্টা চাল। মনে হতাে জিন্না সাহেব যেন ব্রিটিশ পক্ষের ডামি! সেটা কিন্তু ঠিক নয়। তিনিও ছিলেন স্বাধীন খেলােয়াড। ব্রিটিশ শাসকরা তাকে পদ দিয়ে বা উপাধি দিয়ে কিনে নিতে পারেননি। তিনি ছিলেন আনপারচেজেবল। ইনকরাপটিবল। অবিকল গান্ধীজীর মতাে। তবে শেষের দিকে তার ধারণা জন্মেছিল তাস খেলায় ব্রিটিশ পক্ষই তার ডামি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলী, ক্যাবিনেট মিশনের নেতা পেথিক-লরেন্স, বড়লাট ওয়েভেল বা মাউন্টব্যাটেন তার খেলাই খেলবেন, তাঁদের নিজেদের খেলা নয়। দারুণ, নিদারুণ ভ্রম। ইংরেজ আর কারাে খেলা খেলে না। সে ফরাসীর কঁাধে বন্দুক রেখে জার্মানের সঙ্গে লড়ে। মুসলমানের কাধে বন্দুক রেখে হিন্দুর সঙ্গে লড়ে, মুসলিম লীগের কঁাধে বন্দুক রেখে কংগ্রেসের সঙ্গে লড়ে। মিটমাটের সময় যখন আসে তখন প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করে। মিত্রকে তেমন পাত্তা দেয় না। তবে একেবারে পথে বসায় না। জিন্না সাহেব পেলেন ঠিক ততখানি, যতখানি ব্রিটিশ রাজপ্রতিনিধি মাউন্টব্যাটেন মানে মানে সাম্রাজ্য গুটিয়ে নেবার সময় কংগ্রেসের সম্মতি নিয়ে দিতে সক্ষম।
গান্ধীজীকে দিয়ে মানিয়ে নিতে পারতেন না, সেটা তিনি জানতেন। কিন্তু গান্ধীজী যদি তার প্রস্তাবে বাধা দিতেন তা হলে তিনি ১৯৪৮ সালের জুন মাসের পূর্বেই প্রদেশওয়ারি ভাবে ক্ষমতা বণ্টন করে দিয়ে যেতে। ফলে কংগ্রেস পেত আটটি প্রদেশ, সেই আটটিকে নিয়ে কেন্দ্র গঠন করতে পারত, কিন্তু আসামে সৈন্য পাঠাতে পারত না, মাঝখানে পড়ত মুসলিমশাসিত বঙ্গ, উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে সৈন্য পাঠাতে পারত না, মাঝখানে পড়ত মুসলিমশাসিত পাঞ্জাব। তিনটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত পাকিস্তান আরাে দুটিকেও কুক্ষিগত করত। গান্ধীজী কি আরাে এক ফা সত্যাগ্রহের সাহায্যে ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা করতে পারতেন? না, তার জন্যে
আবশ্যক হতে মাউন্টব্যাটেনের মতি পরিবর্তন নয়, মুসলিম লীগের নীতি পরিবর্তন। তার জন্যে জিন্না সাহেবের সঙ্গে একমত হয়ে প্রত্যেকটি প্রদেশে তথা কেন্দ্রে কংগ্রেস লীগ কোয়ালিশন সরকার গঠন। সেটার জন্যে কংগ্রেসকে তথা হিন্দু সম্প্রদায়কে এত বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে হতাে যে কংগ্রেস তত নারাজ হতােই, হিন্দু জনমতও বিদ্রোহী হতে। গান্ধীজী আপনাকে শূন্যে পরিণত করেন। কিন্তু জাত বেনিয়া তিনি, যাচাই করে দেখেন ভারতের মুক্তি নামক মুক্তাটা সাচ্চা না ঝুটা। সেট সাচ্চাই বটে। মাউন্টব্যাটেন ঠকননি। ভারত সত্যিই মুক্ত, যদিও বিভক্ত।
জিন্না সাহেব যেটা পান সেটাও সাচ্চা। যা মােগল আমলে সম্ভব হয়নি, যা ব্রিটিশ আমলে সম্ভব হতাে না, তাই সম্ভব হলে জিন্না-নেতৃত্বে। এই উপমহাদেশের এক-চতুর্থাংশ হলাে ‘দারুল ইসলাম। বাকীটা থেকে গেল ‘দারুল হরব’ । যেমন বরাবর ছিল। মুসলিম দুনিয়ার দিক থেকে কত বড়াে জয় ! কৃতজ্ঞ মুসলিম নেশন জিন্নাকে বাদশাহ বানাতেও পারত। কিন্তু ন্যাশনালিস্ট হিসাবে তিনি অস্থিরমতি হলেও ডেমােক্রাট হিসাবে স্থিরমতি ছিলেন।
| তার মানে তিনি ব্যালটে বিশ্বাস করতেন, বুলেটে নয়। নিতান্ত মরীয়া না হলে তিনি বলতেন না যে তার হাতেও একটা পিস্তল আছে। সেই পিস্তলের নাম ডাইরেক্ট অ্যাকশন। রাশ টানার সাধ্য তার ছিল না, থাকলে মহামারী ঘটে যেত না। খতিয়ে দেখলে মুসলমানই মারা পড়ল বেশী। ভারতবর্ষকে দু'ভাগে বিভক্ত করার ফলে ভারতবর্ষের মুসলিম সমাজও দু’ভাগে বিভক্ত হলাে। চার কোটি মুসলমানকে বিপদে ফেলে তিনি পাকিস্তানে নিষ্ক্রমণ করলেন। কংগ্রেস যদি পাকিস্তানের অনুকরণে হিন্দু রাষ্ট্র পত্তন করত মুসলমানদের দশা হতে যাকে বলে ‘ন; ঘরকা না ঘাটকা’। যেমন দশা হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর পাঞ্জাবী মুসলমান ফেীজের দ্বারা পরিত্যক্ত বিহারী মুসলমানদের। বাংলাদেশ তাদের রাখতে চায় না, পাকিস্তান তাদের নিতে চায় না। কংগ্রেস স্বাধীন ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র করে তাদের প্রথম শ্রেণীর নাগরিকের অধিকার দিয়েছে। জিন্না সাহেবের ইচ্ছা থাকলেও পাকিস্তানে হিন্দু ও শিখদের তিনি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের প্রথম শ্রেণীর নাগরিকত্ব দিয়ে যেতে পারেন নি। হয়তাে দিতেন, যদি আরাে কিছুদিন বেঁচে থাকতেন। কিন্তু যাদের মদত নিয়ে তিনি তখতে বসেছিলেন সেই মােল্লারাই তাকে শাসিয়ে রেখেছিল। আর তার আসল ক্ষমতা চলে গেছল তার প্রধানমন্ত্রী লিয়াকৎ আলী খানের হাতে।
পাকিস্তানী পার্লামেন্টের কাছে, কার্যত প্রধানমন্ত্রীই দায়ী। গভর্নর জেনারেল ভিন্ন। বিদ্যমান ভারত শাসন আইন অনুসারে তার পাকিস্তানী পার্লামেন্টের কাছে দায়ী নন। তার উধ্বতন কর্তৃপক্ষ ব্রিটিশ সরকারের সেক্রেটারি অভ, স্টেট ফর ইণ্ডিয়া। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের পর সেই কর্তৃপক্ষই বা কোথায়? গভর্নর জেনারেল অভ পাকিস্তান কারাে কাছে দায়ী নন। অথচ নামেই সর্বক্ষমতাবান।।
জিন্নাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কোয়েটার কাছে এক স্বাস্থ্যকর স্থানে চিকিৎসকের হেফাজতে। সেখানে নাকি তিনি তার চিকিৎসককে বলেন পার্টিশন হচ্ছে তার জীবনের বৃহত্তম ভুল। সেখান থেকে যখন তাকে করাচীতে ফিরিয়ে আনা হয় তখন তাকে অভ্যর্থনা করতে কেউ বিমান বন্দরে আসেন না। মাটিতে শুইয়ে রাখা হয় তঁাকে। তার দেহের উপর পিঁপড়েরা ঘুরে বেড়ায়। লক্ষ করেন এক বাঙালী মুসলমান বিমানবন্দর কর্মী। মিনিট দশেক পরে তার মন্ত্রীরা আসেন ও তাকে সরানাে হয়। করাচীতে জন্ম, করাচীতেই মৃত্যু। কিন্তু ভারতীয় হিসেবে নয়, পাকিস্তানী হিসাবে। | তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্বে তিনি ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম সভ্য, দাদাভাই নওরােজীর রাজনৈতিক শিষ্য। ভারতীয় জাতির জাতীয় স্বার্থের প্রহরী। মুসলমানদের জন্যে স্বতন্ত্র নির্বাচন ব্যবস্থা তিনি সমর্থন করতেন না, তাতে জাতীয় সংহতি ক্ষুন্ন হয়। মুসলিম লীগের গোড়ার দিকে তিনি তার সভ্য হননি। মুসলিম নির্বাচকমণ্ডলী থেকে নির্বাচিত হয়ে কেন্দ্রীয় আইন সভার সদস্য হওয়ার পর মুসলিম লীগের সভ্য হন। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় তিনি কংগ্রেস ও লীগ দুই প্রতিষ্ঠানের সভ্য হন কী মনে করে, তখন তিনি উত্তর দেন, “আমি ভারতের জাতীয় স্বার্থের খাতিরে কংগ্রেসের সভ্য, আর মুসলিম সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক স্বার্থের খাতিরে মুসলিম লীগের সভ্য। তখনকার দিনে মালবায়জী প্রমুখ কংগ্রেস নেতারা হিন্দু মহাসভাতেও ছিলেন। বৃহত্তর স্বার্থের সঙ্গে ক্ষুদ্রতর স্বার্থের বিরােধ ছিল না। বৃহত্তর স্বার্থ ভারতের স্বরাজ বা হােম রুল। তার প্রথম কিস্তি প্রােদেশিক স্বায়ত্তশাসন। তাতে হিন্দু মুসলমানের স্বার্থ ক্ষুদ্রতর।
তার জীবনের দ্বিতীয় পর্বে তিনি কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে সেতুবন্ধন করেন। লােকমান্য টিলকের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে তিনি লখনউতে ১৯১৬ সালে কংগ্রেস লীগ চুক্তি সম্পাদনে অগ্রণী হন। তখন তার উপর আস্থা জাগে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের। সরােজিনী নায়ডু বলেন, তিনি হিন্দু মুসলিম ঐক্যের রাজদূত। কংগ্রেসের চেয়ে আরাে এক পা এগিয়ে তিনি হােম রুল লীগের সভাপতি হন, যার জন্যে অ্যানী বেসান্ট অন্তরীণ হন। জিন্নার প্রতিপত্তি তখন তুঙ্গে। মডারেটদের চেয়ে উচ্চে। এই পর্বে ছেদ পড়ে কংগ্রেস যখন গান্ধীজীর নেতৃত্বে অহিংস অসহযোগ নীতি গ্রহণ করে। জিন্নার নীতি ননকোঅপারেশন নয়, রেসিপ্রােকাল